বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তীব্র মানবিক সংকটের পটভূমিতে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ঘোষণা করা হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কার। নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টায় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস এবারের বিজয়ীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন।
এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭টি মনোনয়ন জমা পড়েছে, যার মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি সংগঠন রয়েছে। নোবেল কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, মনোনয়ন-সংক্রান্ত সকল নথিপত্র ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। তাই এখন পর্যন্ত যেসব নাম গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা মূলত বিভিন্ন মহলের অনুমান ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে কারা মনোনয়ন পেয়েছেন, তার আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করে না নোবেল কমিটি। ফলে পুরস্কার ঘোষণার আগে যেসব নাম সামনে আসে, সেগুলোর অনেকটাই মনোনয়নদাতা, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল।
তালিকায় থাকা আলোচিত নামগুলোর মধ্যে পোপ লিও অন্যতম। যুদ্ধবিরতি ও শান্তিপূর্ণ সংলাপে তার ভূমিকার জন্য বিশেষজ্ঞরা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় ভূমিকা রাখা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)-এর নামও আলোচনায় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পোপ লিও যুদ্ধ বন্ধ, সংলাপ এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সময়ে তার শান্তির আহ্বান তাকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় এনেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান- এ কারণে দুই আন্তর্জাতিক আদালতকে স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন কিছু বিশ্লেষক।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজের নামও উঠে এসেছে, তবে তার নাম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কিছুটা সংবেদনশীলতা রয়েছে। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও এবারের তালিকায় বিশেষ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যদিও বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের বিতর্কিত পরিস্থিতির কারণে তার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
মানবিক সহায়তা প্রদানের স্বীকৃতি হিসেবে সুদানের ‘ইমারজেন্সি রেসপন্স রোমস’-এর নামও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো (পিআরআইও)-এর পরিচালক হাকন গ্যেরলভের তালিকায় এই সংগঠনের নাম রয়েছে, যারা গৃহযুদ্ধকবলিত অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষায় কাজ করা ইউক্রেনের মাইকোলা কুলেবা এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর নামও সম্ভাব্য বিজয়ীর তালিকায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে যুদ্ধের ফলে বাস্তুচ্যুত শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কাজ আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করা ‘কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিজম’ (সিপিজে)-এর নামও এবার আলোচনায় জায়গা পেয়েছে। পিআরআইও-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ১৩২ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং উদ্বেগজনক।
এবারের তালিকায় সবচেয়ে চমকপ্রদ নাম ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস)। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন দেশ ও মহাকাশ সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় পরিচালিত এই স্টেশনটি বিশ্বজুড়ে সংঘাতের মাঝেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিরল নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্তিয়ান বের্গ হারপভিকেন জানিয়েছেন, বর্তমান পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দিকে কমিটি গভীর নজর রাখছে। শান্তির নতুন কাঠামো যারা তৈরি করছেন, তাদের অবদান এবারের মূল্যায়নে অগ্রাধিকার পেতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত কমিটি কোন নাম চূড়ান্ত করেছে, তা জানতে শুক্রবারের ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ঐতিহাসিকভাবেই নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার আগে অখ্যাত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিজয়ী হওয়ার নজির রয়েছে, তাই চূড়ান্ত ফলাফলে বড় কোনো বিস্ময় থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

















