হলিউডের স্বর্ণযুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র অস্কারজয়ী অভিনেত্রী ইভা মেরি সেইন্ট আর নেই। ১০২ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর প্রতিনিধি জেফ স্যান্ডারসন জানিয়েছেন, মৃত্যুর সময় স্বজনরা তাঁর পাশেই ছিলেন। সাত দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি অভিনয় করেছেন মার্লন ব্র্যান্ডো, ক্যারি গ্রান্ট, পল নিউম্যান ও ওয়ারেন বিটির মতো খ্যাতিমান সব তারকাদের বিপরীতে। গতকাল মঙ্গলবার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাড়িতে তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
১৯২৪ সালে নিউ জার্সির নিউয়ার্কে জন্ম নেওয়া ইভা মেরি সেইন্টের শুরুতে শিক্ষক হওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীকালে তিনি অভিনয়ের নেশায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে এলিয়া কাজানের কালজয়ী সিনেমা ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’-এ এডি ডয়েল চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। নিজের প্রথম ছবিতেই তিনি বাজিমাত করেন এবং সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন। মজার ব্যাপার হলো, অস্কার জয়ের মাত্র দুই দিন পরেই তিনি প্রথম সন্তান ড্যারেলের মা হন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই পারিবারিক জীবনকে চলচ্চিত্রের মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন এই অভিনেত্রী। ‘জুরাসিক পার্ক’-এর তারকা স্যাম নিল মারা গেছেন। ব্র্যান্ডোর তীব্র অভিনয়ের বিপরীতে সেইন্টের সংযত অভিনয় ছবিটিকে দিয়েছিল আলাদা মাত্রা। ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ পরে চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছবি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে নাটকের প্রতি আগ্রহ থেকে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
১৯৫৯ সালে আলফ্রেড হিচককের আলোচিত সিনেমা ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’-এ ইভ কেন্ডাল চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। এই সিনেমায় তাঁর পোশাক থেকে শুরু করে চুল ও মেকআপের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো স্বয়ং হিচকক নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সেইন্ট পরবর্তীতে বলেছিলেন, পরিচালকের সেই নির্দেশনা তাঁকে চরিত্রটির ভেতরে ঢুকতে দারুণভাবে সাহায্য করেছিল। রহস্যময় ইভ কেন্ডাল চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয়। হিচকক তাঁর পোশাক, চুল, মেকআপ থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক বিষয়ও খুব সতর্কভাবে নির্ধারণ করেছিলেন।
অভিনয় জীবনে তিনি একাধিক জনপ্রিয় পরিচালকের সঙ্গে কাজ করলেও ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় নিয়মিত কাজ করার পরিবর্তে পরিবারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। স্বামী জেফ্রি হেইডেনের সঙ্গে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক টিকে ছিল ৬৫ বছর। ২০১৬ সালে স্বামীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁদের এই দীর্ঘ পথচলা ছিল অবিচল। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে অনেক কাজের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়েও দিয়েছেন।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন দুনিয়াতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল। ১৯৯০ সালে ‘পিপল লাইক আস’ মিনি সিরিজে দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য তিনি এমি পুরস্কার অর্জন করেন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৬ সালে ‘সুপারম্যান রিটার্নস’ সিনেমায় মার্থা কেন্ট চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় ফেরেন তিনি। এমনকি আশির কোঠায় পা দেওয়ার পরও ‘উইন্টার্স টেল’-এর মতো ছবিতে তাঁকে দেখা গেছে। ২০১৮ সালের অস্কার অনুষ্ঠানে পুরস্কার উপস্থাপক হিসেবেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। অস্কার ও এমি বিজয়ী এই মহান শিল্পী হলিউডের সোনালি ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

















