যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের ২৪ বছর বয়সি তরুণী লাইবা ইজাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বর্ণপদক পাওয়ার দিন বোনদের সামনে আনন্দে নেচে ও লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি। সৌদি আরবে উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে বৃত্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। ইজাজের স্মৃতিতে, মেয়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি নিজেই সব কাজ করেছি, টিউশনিও করাই। ইজাজ বলেন, ‘এরপর থেকেই আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করি।’। ইজাজ তাঁকে বলেন, তাঁরা সৌদি আরব নয়, যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান। তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারী হওয়ায় তাঁর কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। ওই অর্থ তাঁর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নিতে হবে এবং ডলারে রূপান্তর করতে হবে বলেও জানান তিনি।
এই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে গিয়ে পরিবারটি এক ভয়ংকর প্রতারণার জালে জড়িয়ে পড়ে। এর পরিমাণ প্রায় ১৮ হাজার মার্কিন ডলার।
পরিস্থিতির করুণ পরিণতিতে গত ৯ অক্টোবর ইসলামাবাদে নিজের বাড়ির কাছেই লাইবার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তুমি কি আমার জন্য এটুকু করতে পারবে না?’। নিজের একটি চাকরির পরিচয়পত্রও দেখান।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করা হলেও, তার পরিবার এ ধারণা মানতে নারাজ।
তাদের অভিযোগ, প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ওই ব্যক্তিই লাইবাকে হত্যা করেছেন।
পদার্থবিজ্ঞানে স্বর্ণপদক জয়ী লাইবা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন।
মেয়েকে হার্ভার্ডে পাঠাতে তার বাবা রানা মুহাম্মদ ইজাজ নিজের জমি ও পরিবারের গয়না বিক্রি করেছিলেন।
লাইবার পরিবারের অভিযোগ, যে ব্যক্তি হার্ভার্ডে ভর্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে লাখ লাখ রুপি হাতিয়ে নিয়েছিলেন, তিনিই লাইবাকে হত্যার জন্য দায়ী। তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মেয়ের জীবন। তাঁদের একজন বৃত্তি নিয়ে চীনে গিয়ে ম্যান্ডারিন ভাষা শিখছেন। কিন্তু তখন পরিবার জানত না, সেই স্বপ্নের ভিত্তি ছিল ফাঁকা প্রতিশ্রুতি ও মিথ্যা। ইজাজের ভাষায়, ‘এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।’। আল-জাজিরাকে দেওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, লাইবার আবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু কাগজপত্র ছিল।
পরিবার ও জীবনের পটভূমি
ইসলামাবাদের জি-১০ এলাকার ‘রানা মালিক সেন্টার’ নামে একটি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দোকানের ওপরের ফ্ল্যাটে তিন দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করছে লাইবার পরিবার। প্রতিদিন সকালে বাবার জন্য নিজ হাতে চা বানিয়ে দিতেন লাইবা। ইজাজ অষ্টম শ্রেণি এবং তার স্ত্রী দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও চার মেয়ের সবাই উচ্চশিক্ষিত। লাইবা নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি একটি স্কুলে বিজ্ঞান পড়াতেন এবং টিউশনি করে বাবার ওপর চাপ কমাতে চাইতেন। বিদেশে পড়ার স্বপ্নের কথা জানালে বাবা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। তবে পরে ভর্তির জন্য দেখানো কাগজপত্রের সবই ভুয়া বলে জানতে পারে পরিবার। প্রতারক নোমান নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের কর্মী পরিচয় দিয়ে পরিবারের বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। পরে ভুয়া কাগজপত্রের বিষয়টি জানাজানি হলে ভেঙে পড়েন লাইবা। তবে ওই অর্থে লাইবার বাবা-মায়ের ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও আবার চা করে দিতেন। ঘুমানোর আগে বাবার কাঁধও মালিশ করে দিতেন। এর মধ্যে হার্ভার্ডের ভর্তির প্রস্তাব ও বৃত্তির চিঠি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনসংক্রান্ত একটি ফরম, নিউইয়র্কে বসবাসকারী এক আত্মীয়ের স্পনসরশিপের হলফনামা, লাইবার ছবি সংবলিত দূতাবাসের একটি নথি এবং বোস্টনে যাওয়ার বিজনেস ক্লাসের বিমানের টিকিট ছিল। এতে লাইবার নামে একটি ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং ১২ অক্টোবরের ভিসা সাক্ষাৎকারের তারিখও ছিল।
প্রতারণা ও শেষ পরিণতির দিকে যাত্রা
চলতি বছর ব্লু এরিয়ার একটি কল সেন্টারে কাজের সূত্রে নোমানের সঙ্গে লাইবার পরিচয় হয়।
হার্ভার্ডে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে নোমান প্রথমে ২২ লাখ রুপি এবং পরবর্তীতে আরও অর্থ হাতিয়ে নেন। এর পর নোমান জানান, হার্ভার্ডে আবেদনের জন্য ৭২ লাখ রুপির আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে হবে। পরিবারের গয়নাও বিক্রি করেছি, যাতে চাওয়া ৭২ লাখ রুপি জোগাড় করতে পারি।’।
পরিবারের গয়না ও জমি বিক্রি করে ইজাজ সর্বস্বান্ত হন। ভিসার সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির সময় কোয়েটায় থাকা নোমানের কথাবার্তায় সন্দেহ হলে পরিবার নথিপত্র ট্রাভেল এজেন্সিতে যাচাই করে এবং সব ভুয়া প্রমাণিত হয়। ৯ অক্টোবর নোমান লাইবাকে একটি বার্তা পাঠালে লাইবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নোমানকে গ্রেপ্তারের দুই দিন পর পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়, কিন্তু ২০ অক্টোবর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় সহযোগীদের গুলিতে নোমান নিহত হন। পরিবারের দাবি, নোমানকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
- প্রতারক নোমানকে লাইবার মৃত্যুর দুই দিন পর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
- ২০ অক্টোবর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় নোমান গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য, সহযোগীরা তাকে ছাড়িয়ে নিতে গুলি চালিয়েছিল।
- ২১ অক্টোবর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি লাইবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং নোমানের কাছ থেকে উদ্ধার করা ৫ মিলিয়ন রুপির বেশি অর্থ ফেরত দেন।
- লাইবার মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত সরাসরি কাউকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়নি।
- পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভিডিও ফুটেজে লাইবাকে মোবাইল হাতে একা বের হতে দেখা গেছে এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।
- পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে জামাতা জায়েদ বিন আফজাল মনে করেন লাইবা নিজে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, এটি একটি হত্যাকাণ্ড।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শিক্ষা পরামর্শকই ভর্তি নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, যা এই ঘটনায় সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করেছে।
- লাইবার বাবা রানা মুহাম্মদ ইজাজ মনে করেন, অর্থ ফেরত পেলেও তার মেয়ের প্রাণের ক্ষতিপূরণ অসম্ভব।
- পাকিস্তানের এফআইএ জানিয়েছে, নোমান কোনো নিবন্ধিত ভিসা এজেন্ট ছিলেন না।
- বিদেশে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সতর্ক করতে এই ঘটনা বড় ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
- ঘটনার পর থেকে স্থানীয় প্রশাসন পুরো বিষয়টি নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখছে।
- লাইবার পরিবার এখনো বিচারের অপেক্ষায়, তবে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে বিলম্ব তাদের হতাশ করছে।

















