নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলা এবং নাটোর-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া একটি বিতর্কিত ভিডিওর তথ্য কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নাটোর জেলা বিএনপির মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। দলটির একাংশের অভিযোগ, পূর্বে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও জেলা কমিটির শীর্ষ নেতৃত্ব ওই তথ্য কেন্দ্রকে জানাতে বাধা দিচ্ছেন। তাঁদের এই মনোভাব কমিটির অনেককেই হতাশ করেছে। সভায় শাকিল হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করা হয়েছে।
গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) নাটোর জেলা পরিষদ কার্যালয়ে জেলা বিএনপির এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে ১৮ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং এটি টানা আট ঘণ্টা ধরে চলে। সভা শেষে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান জানিয়েছিলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় না দেখে অপরাধের ভিত্তিতে বিচারের সিদ্ধান্ত এবং সংসদ সদস্য আজিজকে কেন্দ্র করে ছড়ানো ভিডিওটিসহ সার্বিক বিষয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবহিত করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা কমিটি কোনো যুগ্ম আহ্বায়ককে সরাসরি বহিষ্কারের এখতিয়ার না রাখায় কেন্দ্রকে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাঁর যে বিষয়গুলো আমরা দেখেছি, তা লিখিতভাবে এবং মৌখিকভাবে কেন্দ্রকে অবহিত করব।’।
তবে বিশেষ সভার পাঁচ দিন পর, আজ মঙ্গলবার বিকেলে শহরের হরিশপুরে নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে আসাদুজ্জামান জানান, ১ নভেম্বর জেলা আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি কেন্দ্রে কোনো রিপোর্ট বা প্রতিবেদন পাঠাবেন না।
আহ্বায়কের এই আপত্তির কারণেই শাকিল হত্যাকাণ্ড ও সংসদ সদস্যকে কেন্দ্র করে ছড়ানো ভিডিওর বিষয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপিকে কোনো দাপ্তরিক তথ্য পাঠানো সম্ভব হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আসাদুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন, কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চালানো হচ্ছে এবং ভিডিওর সত্যতা যাচাইয়ে উচ্চপর্যায়ের কাজ চলছে। সত্যতা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিল্লুর রহমান, সদস্য আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও আবদুল কাদের মিয়াসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তবে এই সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি বলে দাবি করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজ। ৩৪ সদস্যের জেলা কমিটির মধ্যে মাত্র ছয়জনকে নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি জানান, কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো দিকনির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত একজন যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত বা সাংগঠনিক প্রতিবেদন পাঠানোর নিয়ম নেই। আর এই কারণেই তিনি সদস্যসচিবের দেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন। তাই আমি সদস্যসচিবের ঘোষিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছি।’। অথচ কমিটিতে ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন।
এদিকে গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনার তদন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ। গত ১৪ অক্টোবর রাতে গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় এলাকায় তিনি হামলার শিকার ও মারাত্মক আহত হন। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৬ অক্টোবর ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মারা যান শাকিল। প্রথমে তাঁর বাবা রবিউল করিম গত ১৯ অক্টোবর অজ্ঞাতপরিচয় ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন, যা পরবর্তীতে হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
এই মামলায় ইতিমধ্যে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামানকে (মিন্টু) গ্রেপ্তার করে দুই দফায় রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। একই সাথে ডিবি পুলিশ আল আমিন ও আনিসুর রহমান নামে আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। ডিবি পুলিশ তদন্তের স্বার্থে গুরুদাসপুরের নয়াবাজার এলাকার একটি স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে সাতজনের পাসপোর্ট–সংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে ডিবি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, উক্ত হামলায় অন্তত ১০ জন অংশ নিয়েছিল বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে আসামি ও জড়িত সন্দেহভাজন সাতজন ব্যক্তি অবৈধ পথে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে তথ্য পাওয়ার পর, দেশের সব স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরে তাঁদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির অনুরোধ জানানো হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ দল বাকি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে বর্তমানে অভিযান পরিচালনা করছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র আজ মঙ্গলবার জানায়, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শাকিল হত্যায় অন্তত ১০ জন অংশ নিয়েছিলেন।

















