যশোরের আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং আমেরিকান নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশি তরুণ ড. শেখ মো. আলী জাকের শাওন। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে ‘সিনিয়র প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছেন। এই পদের অধীনেই তিনি নাসা ও মার্কিন নৌবাহিনীর গভীর সমুদ্র অভিযানের জন্য বিশেষ পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যাটারি তৈরির সংবেদনশীল গবেষণায় যুক্ত হওয়ার বিরল গৌরব অর্জন করেছেন।
যশোরের ছেলে শাওন তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরুতেই মেধার স্বাক্ষর রাখেন। তিনি যশোরের বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে ২০০৭ সালে এসএসসি এবং ২০০৯ সালে এইচএসসি পাস করার পর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। স্নাতক সম্পন্ন করার পর চট্টগ্রামের ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ প্রতিষ্ঠানে একজন প্রসেস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হয়েছিল। তবে বিশ্বমঞ্চে কাজ করার অদম্য লালসা থেকে ২০১৯ সালে তিনি পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার শুরুতে তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, রিও গ্র্যান্ড ভ্যালিতে সম্মানজনক ‘প্রেসিডেনশিয়াল গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ’ লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির কেমিক্যাল অ্যান্ড বায়োমলিক্যুলার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে সফলভাবে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। গবেষণার পাশাপাশি প্রবাসী শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে তিনি ভ্যান্ডারবিল্ট ক্যাম্পাসে ‘বাংলাদেশি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ গড়ে তোলেন এবং এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
গবেষক হিসেবে টেকসই পরিবেশ ও নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে শাওন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির শিহোং লিন রিসার্চ গ্রুপ ও ভিন্সের সর্বাধুনিক পরীক্ষাগার ব্যবহার করে তিনি ন্যানো-প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ ঘটিয়েছেন। বর্জ্য পানি থেকে ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া নিষ্কাশন করে সরাসরি সারে রূপান্তরের এক অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য ভ্যান্ডারবিল্টের ‘ন্যানোডেই’ পোস্টার প্রতিযোগিতায় তাঁর গবেষণা তৃতীয় স্থান অর্জন করে। এই প্রযুক্তিটি জলদূষণ প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রচলিত শক্তিক্ষয়কারী হেবার-বশ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।
শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব চক্রাকার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শাওন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘পারভাপোরেশন মেমব্রেন’ তৈরি করেছেন, যা কম খরচে জৈব দ্রাবক থেকে পানিমুক্তকরণে সক্ষম। একই সাথে তিনি লিথিয়াম আহরণের বিকল্প ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর উদ্ভাবনী এসব বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র নেচার কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, নেচার ওয়াটার, ন্যানো এনার্জি এবং জার্নাল অব মেমব্রেন সায়েন্সের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে স্থান পেয়েছে।
নিজের এই অসামান্য অর্জনে উচ্ছ্বসিত শাওন জানান, নাসার চন্দ্রাভিযান এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সমুদ্র অভিযানের বিশেষ প্রজেক্টে নিউক্লিয়ার ব্যাটারি তৈরির প্রকল্পে যুক্ত থাকা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় পাওয়া। তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন কিছু মৌলিক গবেষণা সম্পন্ন করার, যা ভবিষ্যতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আসবে। এছাড়া নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো পেশাগত কাজের মাধ্যমে দেশের জন্য নোবেল পুরস্কার বয়ে আনার উচ্চাশা ব্যক্ত করেন এই বাংলাদেশি প্রকৌশলী।











