রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক ধস এবং সামাজিক অস্থিরতায় ইসরাইল এক চরম সংকটের মুখে পড়েছে। গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান এবং লেবানন ও ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত দেশটির আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে নাজুক করে তুলেছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ কিংবা রাষ্ট্রীয় পতনের ঝুঁকি দেখছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইএ’র ‘রেড সেল’ ইউনিট গত আগস্ট মাসে ‘ফ্র্যাকচার ফ্রম উইদিন’ বা ভেতর থেকেই ভাঙন শিরোনামে এই বিশেষ পর্যালোচনাটি প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ২৭শে অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসরাইলে পরিস্থিতি বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে। তবে এই গোয়েন্দা পর্যালোচনায় কেবল ইহুদি নাগরিকদের সংকটকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে; জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মার্কিন গোয়েন্দাদের মতে, এই সংকট কেবল একটি অনুমান নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ঝুঁকি এখন অত্যন্ত বাস্তব।
গোয়েন্দা নথিতে জার্মানির প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান ইসরাইলের তুলনা টানা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরা হাজার হাজার সশস্ত্র ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সেনাসদস্যদের বেসামরিক জীবনে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জকে এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পিটিএসডিতে আক্রান্ত এবং আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত এই সেনারা সমাজে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেন বলে কর্মকর্তাদের আশঙ্কা।
ইসরাইলি সমাজে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বৈষম্যও বড় ধরনের ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি করেছে। ঐতিহাসিকভাবে কট্টর অর্থোডক্স বা হারেদি ইহুদিরা ধর্মীয় পড়াশোনার খাতিরে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে ছাড় পেয়ে আসছেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সাধারণ রিজার্ভিস্টদের বারবার ফ্রন্টলাইনে যেতে হওয়ায় অর্থোডক্সদের এই বিশেষ সুবিধা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। যুদ্ধের প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ও আকাশচুম্বী হয়েছে, যার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে গত দুই বছরে শুধু খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দেশটিকে এক গভীর সাংবিধানিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহু কিংবা তার বিরোধী পক্ষ— কারোরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এর ওপর পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইলকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন, যা দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমশ একঘরে করে ফেলছে। বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ কমে যাওয়া ইসরাইলের বিদ্যমান এই ভাঙনকে আরও ত্বরান্বিত করছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা।

















