ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ অভিযান রুখতে কার্যত পুরো দিল্লি শহর অচল করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে বাদ সাধলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করে বলেন, ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো যায় না।’ আন্দোলন মোকাবিলার নামে জনজীবন এভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে আদালত মন্তব্য করেছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশ
আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আন্দোলন দমনের অজুহাতে দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একইসাথে টানা ১০ ঘণ্টা রেলস্টেশনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হবে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছেন, ট্রেন ও মেট্রো চলাচল এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সেই সাথে কোথায় কী বিধিনিষেধ রয়েছে, তা জনসাধারণকে আগেভাগে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আশ্বস্ত করেছেন যে, জনদুর্ভোগ এড়াতে মেট্রো ও ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড শিথিল করা হবে। দিল্লির রেলস্টেশনগুলোতে আগামীকাল ১০ ঘণ্টা কোনো ট্রেন যাওয়া–আসা করবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। দিল্লির সীমান্তে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। দিল্লির হোটেলগুলোকে বলা হয়েছে, দুই দিন যেন কোনো অতিথিকে ঘর ভাড়া না দেওয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাঁরা যেন আন্দোলনের শরিক না হন। আন্দোলন রুখতে আধা সামরিক বাহিনীর ২৩ হাজার জওয়ান মোতায়েন এবং মেট্রো ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখার উল্লেখ করে তাঁরা জানতে চান, দেশে এসব ঘটছেটা কী। বেশির ভাগ মানুষই ট্রেন–মেট্রোয় যাতায়াত করেন। তা ছাড়া গাড়ি চলাচলের রাস্তায়ও ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।
বিক্ষোভের স্থান ও সাংবিধানিক অধিকার
প্রধান বিচারপতি আরও নির্দেশ দিয়েছেন, যদি যন্তর মন্তর বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত স্থান না হয়, তবে সরকারকে এমন অন্য কোনো এলাকা নির্ধারণ করতে হবে যেখানে সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থাকবে। কপিল সিব্বাল, গোপাল শংকরানারায়ণ, অভিষেক মনু সিংভি, বৃন্দা গ্রোভার, এন হরিহরণ এবং প্রশান্ত ভূষণসহ বিশিষ্ট আইনজীবীরা আজ এই মামলায় সওয়াল করেন।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও সরকারি পদক্ষেপ
সিইসি জ্ঞানেশের অপসারণ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের পাশাপাশি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। শনিবার ১০ অক্টোবর এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশ প্রশাসন কার্যত নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশন বন্ধ, হোটেলগুলোতে অতিথি গ্রহণে বিধিনিষেধ, ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিতের পরিকল্পনা এবং সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার তরুণকে আটক করার খবরও পাওয়া গেছে। এমনকি অ্যাপ নিয়ন্ত্রিত ভাড়ার গাড়িও নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
- সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস সরকারি কঠোরতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ রুখতে এ ধরনের অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ জরুরি অবস্থার শামিল।
- ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি সিজেপির এই আন্দোলনে শরিক হতে জার্মানি থেকে এসেছেন, যিনি এর আগে বেঙ্গালুরুর সমাবেশেও যোগ দিয়েছিলেন।
- সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন ‘আইসা’-এর নেত্রী নেহা বোরা ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘সরকার দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করেছে। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ও ব্রিটিশরা একইভাবে দমননীতি চালিয়েছিল, কিন্তু সফল হয়নি। আমরা গ্রেপ্তার হলেও আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।’
রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠক
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের ১০ জন নেতা আজ শুক্রবার রাত আটটায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সাথে দেখা করার অনুমতি পেয়েছেন। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে তাদের দাবি ও সরকারের দমননীতির বিষয়টি তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পর দিল্লির সার্বিক জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে, কারণ আদালত আন্দোলন ও নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। প্রধান বিচারপতির মন্তব্যটি ভারতজুড়ে এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে জনজীবন অচল করে দিয়ে আন্দোলন দমন করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের কাছে আদালতের বার্তাটি হলো, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব, আন্দোলন দমনের নামে জনজীবন স্তব্ধ করা নয়।

















