ভোলার উপকূলীয় জনপদ চরফ্যাশনে ডাব এখন আর কেবল বাড়ির গাছের সাধারণ ফল নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি। একসময় অবহেলায় পড়ে থাকা নারিকেল গাছগুলো এখন হাজারও পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। বাগান থেকে সংগৃহীত ডাব দেশের বড় বড় শহরের বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে, আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘিরে গড়ে উঠেছে শতকোটি টাকার একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। একসময় বাড়ির আঙিনায় কিংবা বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছের ডাব ছিল অনেকটা অবহেলিত সম্পদ। সেই অবহেলিত ডাবই এখন উপকূলীয় জনপদের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চরফ্যাশন শহর ও গ্রামাঞ্চল জুড়ে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেল গাছের বাগান রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা পেলে প্রতি হেক্টর জমিতে থাকা ১২০ থেকে ১৫০টি গাছ থেকে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ১৬০টি পর্যন্ত ডাব উৎপাদন সম্ভব। কৃষি বিভাগের এই পরিসংখ্যান উপকূলীয় কৃষকদের নারিকেল গাছের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলেছে।
ডাবের চাহিদা বাড়ায় কৃষকরা এখন গাছের নিয়মিত পরিচর্যায় মনোযোগী হয়েছেন। দুলারহাটের নীলকমল ইউনিয়নের আলাউদ্দিন মাস্টারের মতো অনেক চাষি এখন তাদের বাগানের রোগবালাই দমনে সতর্ক। আলাউদ্দিন জানান, আগে অযত্নে পড়ে থাকা পাঁচ শতাধিক গাছ থেকে তেমন আয় হতো না, কিন্তু বর্তমানে শুধু ডাব বিক্রি করেই তিনি বছরে বাড়তি ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করছেন। একই চিত্র দেখা যায় চর মানিকা এলাকার রফিজল মোল্লার বাগানেও। বাড়ির আশপাশের দুই শতাধিক নারিকেল গাছ থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ইতোমধ্যে ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখছেন। যথাযথ পরিচর্যার অভাবে গাছেই নষ্ট হতো অনেক ডাব, আর ন্যায্য দাম না পাওয়ায় গৃহস্থদেরও ছিল না তেমন আগ্রহ। তীব্র গরমে তৃষ্ণা মেটাতে প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে ডাবের পানির চাহিদা দীর্ঘদিনের। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে প্রাকৃতিক পানীয়ের গুরুত্ব বাড়ায় বাজারে ডাবের কদরও বেড়েছে।
চরফ্যাশনের ডাব বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কলমির মোড়ের আড়তগুলো। এখানে প্রতিদিন ভোরে শুরু হয় ডাব সংগ্রহ, বাছাই ও দূরপাল্লার মোকামে পাঠানোর কর্মযজ্ঞ। স্থানীয় আড়তদার মো. কবির হোসেন জানান, ফড়িয়ারা গৃহস্থদের কাছ থেকে প্রতি জোড়া ডাব ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় কিনে আড়তে আনেন। এরপর আড়তদাররা সেগুলো ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠান। কবির নিজেই সপ্তাহে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকার ডাব দেশের বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করেন।
চরফ্যাশনে কবির হোসেনের মতো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন বড় আড়তদার রয়েছেন। এদের একেকজনের মাসিক বেচাকেনার পরিমাণ ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই বিশাল বাণিজ্যের সুফল শুধু বাগান মালিকরাই পাচ্ছেন না, বরং সংগ্রহকারী, পরিবহন শ্রমিক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের মতো বড় বাজারগুলোতে চরফ্যাশনের ডাবের বিপুল চাহিদা রয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তারাও এই বাণিজ্যিক ধারায় যোগ দিয়েছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে অনেক তরুণ এখন অনলাইনে সরাসরি বাগান থেকে তাজা ডাব সংগ্রহ করে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন। এই আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা প্রচলিত আড়তদারদের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সাফল্য ধরে রাখতে পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। পাশাপাশি হাসপাতাল ও রোগীদের জন্যও ডাব কেনেন অনেকে।
চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা জানান, এখানকার ডাবের আকার বড়, পানি সুমিষ্ট এবং পরিমাণে বেশি হওয়ায় বাজারে এর আলাদা কদর রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের বিনামূল্যে উন্নত জাতের নারিকেল চারা প্রদান, বালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কারিগরি পরামর্শ এবং নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
উপকূলের এই ডাব বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক জাগরণ তৈরি হয়েছে, তা সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। পরিকল্পিত বাগান ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

















