চলতি বছর যশোর শিক্ষা বোর্ডে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা গতবারের তুলনায় ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ কম। পাশের হারের পাশাপাশি বোর্ডে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও। এ বছর মোট ৩ হাজার ২২৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২ হাজার ৭৬৭ জন কম।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বেলা ১১টায় যশোর শিক্ষা বোর্ডের কনফারেন্স রুমে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরীক্ষার এই আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ করেন বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন।
ফলাফল মূল্যায়ন ও বোর্ডের বক্তব্য
পাশের হার এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা হ্রাস পেলেও এটিকে ‘ফল বিপর্যয়’ হিসেবে মানতে নারাজ বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি ও পরীক্ষার নিয়মে পরিবর্তনের কারণেই শিক্ষার্থীদের সঠিক ও প্রকৃত মেধার চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষকরা তাদের কাছে আসা উত্তরপত্র যেভাবে পেয়েছেন, নিরপেক্ষভাবে সেভাবেই মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছেন।
বোর্ড সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন এ বিষয়ে বলেন, আমরা কোয়ালিটি চাই, কোয়ান্টিটি নয়। যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনায় নিয়মিত ও মনোযোগী থাকবে, কেবল তারাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনে সক্ষম হবে।
পরীক্ষার্থী ও পাসের সামগ্রিক পরিসংখ্যান
এ বছর যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা ১০টি জেলার ৫৭১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৭৯১ জন পরীক্ষার্থী ২৪০টি সেন্টারে পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫০ হাজার ৬৬৮ জন শিক্ষার্থী। পরীক্ষা চলাকালে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ৪৩ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
বিষয়ভিত্তিক পাসের হারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ইংরেজিতে পাসের হার নেমে এসেছে ৫৪ দশমিক ৯৫ শতাংশে। এ ছাড়া আইসিটিতে পাশ করেছে ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ, উচ্চতর গণিতে ৬৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, রসায়নে ৭৭ দশমিক ৪৮ এবং অ্যাকাউন্টিংয়ে ৭৬ দশমিক ২২ শতাংশ। এ ছাড়া আইসিটিতেও শিক্ষার্থীরা বেশ খারাপ করেছে।
ইংরেজি ও আইসিটিতে পাসের হার অস্বাভাবিক কম হওয়ায় তা মূল ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানান সচিব। ইংরেজি বিষয়ের দুর্বলতা কাটানোর বিষয়ে তিনি বলেন, দুর্বলতা উত্তরণে আন্তঃবোর্ডের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সভার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ক্লাসে শিক্ষার্থীদের প্রতি বাড়তি গুরুত্ব প্রদান করার বিষয়টি পরিকল্পনাধীন রয়েছে।
জেলাওয়ারী পাসের হার
পাসের হারের বিচারে এ বছর বোর্ডের ১০টি জেলার মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে যশোর জেলা, যেখানে পাসের হার ৫২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে খুলনা জেলা (৪৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ) এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা (৪৬ দশমিক ১৩ শতাংশ)।
পর্যায়ক্রমে কুষ্টিয়ায় ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সাতক্ষীরায় ৪৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ঝিনাইদহে ৪১ দশমিক ৯৮ শতাংশ, মেহেরপুরে ৪০ দশমিক ৭৬ শতাংশ, বাগেরহাটে ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, মাগুরায় ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং সবার নিচে নড়াইল জেলায় পাসের হার ৩৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
শতভাগ পাশ ও শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান
চলতি বছর যশোর বোর্ডে মাত্র ৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল পরীক্ষার্থী পাশ করেছে, যা গত বছর ছিল ৫টি। শতভাগ পাশ করা প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ (পরীক্ষার্থী ৪৩ জন), খুলনার খালিশপুর নেভি অ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ (পরীক্ষার্থী ৬১ জন) এবং চুয়াডাঙ্গার ব্রাইট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (পরীক্ষার্থী ২৩ জন)।
অন্যদিকে, একজন পরীক্ষার্থীও পাশ করেনি এমন শূন্য পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬টিতে। গতবার এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০টি। চলতি বছর কোনো শিক্ষার্থী পাশ না করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো যেমন গতবারের সংখ্যা ছিল ২০, এবার ১৬।
- খুলনা জেলার ৬টি প্রতিষ্ঠান: ডুমুরিয়ার মডেল মহিলা কলেজ (পরীক্ষার্থী ৩), খুলনা সদরের ইন্ডিপেনডেন্ট আইডিয়াল কলেজ (১১), কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির (৩), কয়রা শাকবাড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২৭), রূপসা উপজেলার কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস স্কুল (১) এবং খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১২)।
- কুষ্টিয়া জেলার ২টি প্রতিষ্ঠান: মিরপুর উপজেলার হাজি নুরুল ইসলাম কলেজ (৮) ও কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর আইডিয়াল কলেজ (১)।
- মাগুরা জেলার ২টি প্রতিষ্ঠান: বুজরুক শ্রীকুন্ডি কলেজ (১৫) ও মহম্মদপুর উপজেলার গোপীনাথপুর এম এ খালেক স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২)।
- সাতক্ষীরা জেলার ২টি প্রতিষ্ঠান: ইসলামিয়া মহিলা কলেজ (৩) ও একে ফজলুল হক এমসিএ কলেজ (৪৯)।
- মেহেরপুর জেলার ১টি প্রতিষ্ঠান: মরকা জাগরণ কলেজ (১)।
- ঝিনাইদহ ও যশোর জেলার ২টি প্রতিষ্ঠান: ঝিনাইদহের মল্লিক শহিদুল ইসলাম কারিগরি কলেজ (১৯) ও যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সবুজপল্লী কলেজ (৭)।
- নড়াইল জেলার ১টি প্রতিষ্ঠান: মাকরাইল করিম খালেক সোলায়মান ইনস্টিটিউট (৪৩)।
শূন্য পাসের প্রসঙ্গে বোর্ড সচিব বলেন, শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এর আগেও শোকজ করা হয়েছিল এবং তার ইতিবাচক ফল হিসেবেই এবার শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান ২০টি থেকে কমে ১৬টিতে এসেছে। এবার এসব প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি নবায়ন স্থগিত রাখা কিংবা কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হবে।

















