কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে নলকূপ স্থাপনের সময় মাটির গভীর থেকে বের হওয়া গ্যাসের উৎসস্থলে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেখানে নির্গত গ্যাসে টানা পাঁচ দিন ধরে আগুন জ্বলছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) আগামী ১৫ দিন বিষয়টি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেখানে ‘রিলিফ কূপ’ খননের বিকল্প ভাবছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ইনানীর এই উৎস থেকে যদি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মজুত নিশ্চিত হয়, তবে তা জাতীয় জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে বর্তমানে নির্গমন বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে তীব্র দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, এটি একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা ‘শ্যালো রিজার্ভার’ হতে পারে। ইতিমধ্যে দুর্ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইনানীর পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে পর্যবেক্ষণের এই সিদ্ধান্ত নেয়।
উখিয়া উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর সকাল সাতটার দিকে জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বসতবাড়িতে নলকূপ বসানোর কাজ চলছিল। পাইপ মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পৌঁছালে হঠাৎ তীব্র বেগে গ্যাস বের হতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে এবং বাপেক্সের কারিগরি দল ঘটনাস্থল ঘুরে পরামর্শ প্রদান করে।
পরবর্তীকালে জননিরাপত্তা জোরদারে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটিকে কয়েকটি নিরাপত্তা জোনে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার এক আদেশে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার সীমানায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। আদেশে বলা হয়, নির্দেশিত এলাকায় যেকোনো ধরনের আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে এমন সব কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে আইনি ব্যবস্থা। যানবাহন নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা টাঙিয়ে মাইকিং করা হচ্ছে। তবুও কৌতূহলী জনতার ভিড় পুরোপুরি সামলানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন বিকেল চারটার পর থেকে সেখানে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা স্থাপন করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কও বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ছৈয়দ আলম ও শহিদুল আলম জানান, প্রথমে বাপেক্সের পক্ষ থেকে ৭২ ঘণ্টার কথা বলা হলেও দিন দিন আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। ঘটনার তিন দিন পর প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে কাঁটাতারের বেড়া দিলেও উৎসুক মানুষের আনাগোনা থামানো যাচ্ছে না, যা পুরো এলাকার জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছে। আরেক বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন জানান, আগুনের কারণে প্রধান সড়ক ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটছে। দূরবর্তী পথ ঘুরে যাতায়াত করতে গিয়ে বিশেষ করে স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় গ্যাসের চরিত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া আগুনের শিখার রঙ দেখে গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেল বা কনডেন্সটের উপস্থিতি অনুমান করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকৌশলী মো. শোয়েব আরও জানান, বাংলাদেশে সাধারণত ভূগর্ভের ১.৫ থেকে ৫ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের সন্ধান মেলে। তবে এটি অগভীর হওয়ায় উৎস ও মজুত নিশ্চিত করতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। যদি এই ১৫ দিনে আগুনের তীব্রতা না কমে বা একই রকম থাকে, তবে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ‘রিলিফ কূপ’ খনন করে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর যদি প্রাকৃতিক নিয়মেই গ্যাসের চাপ কমে বন্ধ হয়ে যায়, তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইনানীর মূল উৎসের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস বের হতে দেখা গেছে, যা ভূগঠনগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পর্যবেক্ষণ পর্ব শেষ হলে বাপেক্স ওই এলাকায় একটি ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ চালাবে। জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যদি সেখানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মজুত নিশ্চিত হওয়া যায়, তবে পূর্ণাঙ্গ কূপ খননের কাজ শুরু করবে সরকার।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুক্তাদির জানান, এ ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও কারিগরি অভিজ্ঞতা বাপেক্সের রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তুতি থাকলেও সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
ইনানী ছোট খাল এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে টানা পাঁচ দিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুন নিয়ে এখনো আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। তবে প্রশাসনিক নজরদারি ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দ্রুত একটি নিরাপদ সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

















