মানসিক রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ১৯৫৭ সালে পাবনার হেমায়েতপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম ও একমাত্র বিশেষায়িত এই হাসপাতাল। দীর্ঘ সাত দশক পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটির অবকাঠামো ও জনবল সংকট কাটেনি। চিকিৎসক, ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিসহ নানা সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, যার ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে ১৯টি ওয়ার্ডে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে পাঁচটি নারী ও ১৪টি পুরুষ ওয়ার্ড। তবে শিশু-কিশোর এবং আত্মহত্যার প্রবণতা থাকা রোগীদের ভর্তির কোনো সুযোগ নেই এই হাসপাতালে। ভর্তির জন্য হালনাগাদ জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মসনদ ও ১৫ টাকা ভর্তি ফি বাধ্যতামূলক; এছাড়া পেয়িং বেডের জন্য মাসিক ৯,৭৫০ টাকা জমা দিতে হয়। সাত দশকেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি পাবনা মানসিক হাসপাতালে। বিনোদন বলতে নার্সদের রুমের দেয়ালে থাকা দূরবর্তী টেলিভিশনের দিকে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকা। অবস্থার অবনতি হলে কিংবা অনেক অর্থ ব্যয়ের পর তারা হাসপাতালে আসেন।
জনবল ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংকট
কাগজ-কলমে হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার হলেও এর প্রশাসনিক ও জনবল কাঠামো এখনো আড়াই দশক আগের ২৫০ শয্যার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
ঢাকার ২০০ শয্যার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ৫০ জন চিকিৎসক থাকলেও পাবনায় ৫০০ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ মাত্র ৩১টি, যার মধ্যে ৯টিই শূন্য। প্রথম শ্রেণির সাতটি পদের মধ্যে চারটি, দ্বিতীয় শ্রেণির সাতটি, তৃতীয় শ্রেণির ২৩টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৭০টি পদের মধ্যে ১১০টি পদ দীর্ঘকাল ধরে খালি পড়ে আছে। এছাড়া চিকিৎসা ও থেরাপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পদের একটিতেও কোনো জনবল নেই। ফলে রোগীদের ইইজি ও ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপির মতো জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। হাসপাতালের বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করাতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ৫০০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩১টি হলেও বর্তমানে কর্মরত ২২ জন।
সেবা কার্যক্রম ও অমানবিক উপদ্রব
হাসপাতালকর্মীদের মতে, রোগীদের চার বেলার খাবারের জন্য বরাদ্দ ১৭৫ টাকা থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স কেটে নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একসময় রোগীদের তাঁত, বেত ও দর্জির কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও বর্তমানে তা পুরোপুরি বন্ধ। প্রশিক্ষণ ভবনগুলো বর্তমানে নিরাপত্তাকর্মীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রোগীদের জীবন এখন কেবল খাওয়া ও ঘুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর ওপর তথাকথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অমানবিক উপদ্রব নতুন সংকট তৈরি করেছে। নিরাপত্তারক্ষীদের ম্যানেজ করে তারা ভেতরে ঢুকে রোগীদের বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করে ভিডিও তৈরি করছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের ফলে রোগীরা নতুন করে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এর মধ্য থেকে ১৮ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স কেটে নেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ ভবনগুলোয় থাকছেন নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার বাহিনীর সদস্যরা।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিকিৎসায় বিচ্যুতি
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সামিনা আক্তার জানান, সামাজিক সচেতনতার অভাবে অনেকে শুরুতে কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেন। বিশেষ করে নারীদের মানসিক সমস্যার লক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলা করা হয়। অন্যদিকে, কনসালট্যান্ট ডা. একেএম শফিউল আযম উল্লেখ করেন, রোগী ভর্তিতে এনআইডি বাধ্যতামূলক করার আগে অনেক পরিবার ভুয়া ঠিকানা দিয়ে রোগী রেখে যেত। ১৯৯৫ সালে ভর্তি হওয়া রোগীও দীর্ঘকাল স্বজনহীন ছিলেন, যাদের আদালতের নির্দেশে সেফ হোমে পাঠাতে হয়েছে। তিনি একে চরম অমানবিক বলে অভিহিত করেছেন। আবার অনেকেই মানসিক সমস্যার জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের বদলে নিউরোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যান, যা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তোলে। ১৯৯৫ সালে ভর্তি হওয়া রোগী চলতি বছরও পরিবারের দেখা পাননি—এমন ঘটনাও রয়েছে।
সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বান
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম ফারুক সরকার বলেন, হাসপাতালের আধুনিকায়নের পাশাপাশি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। তার মতে, ১,০০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে পারে, তবে নেতিবাচক মানসিকতা দূর না হলে রোগীদের প্রতি অবহেলা কমবে না। মানসিক রোগকে অন্যান্য শারীরিক রোগের মতো স্বাভাবিকভাবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এত সংকটের মধ্যেও নতুন স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ জানান, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সম্প্রতি ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট নির্মাণে এক হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম, গবেষণা, আধুনিক পুনর্বাসন কেন্দ্র ও টেলিমেডিসিন সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী আসলেও শয্যা সংকটের কারণে সবাইকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। মানসিক রোগ ডায়াবেটিসের মতো, যা নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অথচ সমাজে রোগীদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণ তাদের পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

















