ভারতীয় সংসদের দুই কক্ষে অভিশংসন প্রস্তাব গৃহীত না হলেও বিরোধী দলের নেতারা এবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘গণ অভিসংশন’ বা প্রতীকী অপসারণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। শনিবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সরকারি বাসভবনের লনে আয়োজিত এই বিশেষ সভায় বিরোধী দলের নেতারা সিইসির বিরুদ্ধে ৬টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করেন। এসআইআর নিয়ে কি ফেঁসে যেতে পারেন সিইসি জ্ঞানেশ, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কী বলছেন। সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে চলা এই ‘গণ অভিশংসন’ আয়োজনে বিভিন্ন নেতা জ্ঞানেশ কুমারের সমালোচনা করেন।
প্রস্তাব উত্থাপনকালে মল্লিকার্জুন খাড়গে স্পষ্ট করে বলেন, সিইসির সঙ্গে তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। বরং তিনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বলেই তাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। খাড়গে বলেন, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর নির্দেশনায় জ্ঞানেশ কুমার গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো হলো জ্ঞানেশ কুমারকে মোট ৬টি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ‘গণ অভিশংসন’ প্রস্তাব উল্লেখ করে মল্লিকার্জুন খাড়গে একে একে অভিযোগগুলো পড়ে শোনান। কমিশন ৩ সদস্যের হওয়া সত্ত্বেও অন্য দুই কমিশনারকে অন্ধকারে রেখে তিনি একা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ও তা চাপিয়ে দিয়েছেন। পুলিশকে ফাঁকি দিয়েছেন ঠিকই, মোদির জন্য কি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারবেন নেহা বোরা। এটা এখন আর কোনো দল বা গোষ্ঠীর আন্দোলন নয়। জ্ঞানেশ কুমারকে সরালেও বিপদ, রাখলেও বিপদ—নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পড়ল মোদি সরকার। কোনো প্রস্তাব এভাবে সর্বসম্মতিতে বিনা বিরোধিতায় পাস হতে দেখেননি।
- সিইসি হিসেবে নিরপেক্ষতার পথ পরিহার করে তিনি শাসক দলের হয়ে ভোট চুরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন।
- এই চক্রান্তের অংশ হিসেবে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ইতিমধ্যেই ১৩ কোটি ৩০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
- সংসদকে পাশ কাটিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ‘ফর্ম ৬’ পরিবর্তন করেছেন তিনি।
- ইসিআইনেটের মাধ্যমে ভোটার তালিকার কেন্দ্রীকরণ করার মতো বিতর্কিত উদ্যোগ নিয়েছেন।
- তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন হওয়া সত্ত্বেও অন্য দুই কমিশনারকে অন্ধকারে রেখে তিনি একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন।
- তিনি ব্যক্তিগত নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নির্দেশে কাজ করেছেন।
খাড়গে আরও স্মরণ করিয়ে দেন, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে কাজ না করা এবং বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার অপরাধে ৭ মাস আগে সংসদের উভয় কক্ষের ১৯৩ জন সদস্য অভিশংসনের নোটিশ জমা দিয়েছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে বিবেচনা না করেই বাতিল করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিজেপি বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে তহবিল বৃদ্ধি করছে। খাড়গে বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে ২০১৪ থেকে বিজেপি একের পর এক ষড়যন্ত্র করে চলেছে। নির্বাচনী বন্ড মারফত টাকা তুলে দলে তহবিল বাড়িয়েছে। ইডি, সিবিআইসহ কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে।
এই প্রতীকী সভায় রাহুল গান্ধী বলেন, নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনকে অবৈধ করে তুলেছে। তাঁর মতে, জ্ঞানেশ কুমারের এই কর্মকাণ্ড কেবল অভিসংশনযোগ্য নয়, বরং এটি দেশদ্রোহের শামিল। রাহুল বলেন, তাঁদের কাছে জ্ঞানেশকে সরানোর জন্য যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং বিজেপি তাঁকে নিয়ে জেদাজেদি করলে তাদের প্রকৃত চরিত্রই বেরিয়ে আসবে।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, বেছে বেছে ভোটার তালিকা থেকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা গণতন্ত্র হত্যার সামিল। পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়েন ভোটারদের মধ্যে ৭১ শতাংশ মুসলমান।
সভায় স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইউপিএ আমলের সাবেক লোকসভা স্পিকার মীরা কুমার। সবশেষে উপস্থিত সবাই হাত তুলে সর্বসম্মতিক্রমে অভিসংশন প্রস্তাবটি অনুমোদন করেন। সভাটি জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে শেষ হয় এবং সেই সাথে ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’ স্লোগান ওঠে।
বিরোধীদের এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছে বিজেপি। দলটির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র এটিকে কটাক্ষ করে বলেন, রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে এবং তিনি এখন নকল সংসদে নকল প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করছেন। উল্লেখ্য, শুক্রবার এই আয়োজন হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে তা পিছিয়ে শনিবার দুপুরে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পুরনো সংসদ ভবনের সেন্ট্রাল হলের আদলে মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়েছিল। আর এই জ্ঞানেশদের রক্ষাকবচ দিতে সংসদ থেকে শতাধিক সদস্যকে বহিষ্কার করে বিজেপি আইন পাস করেছে, যা দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতিরও নেই। রাহুল বলেন, দেশের যুব, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক সবাই বুঝে গেছে ভোট চুরি হলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।

















