কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন এবং দ্রুত প্রসার বর্তমানে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য এক বড় আলোচনার বিষয়। এ প্রযুক্তি কম্পিউটার কোড লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা প্রদান এবং নথি সংক্ষেপ করার মতো কাজগুলো দক্ষতার সাথে করায় শ্রমবাজারের প্রাথমিক পর্যায়ের সাদা কলারের চাকরিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতে থাকা তরুণ কর্মীদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এআই এআই ডাক পাড়ি, মোদের এআই কার বাড়ি। এআই প্রযুক্তির দৌড়ে আমরা পিছিয়ে কেন।
এআই খাতের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব দাবি করেছেন যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই শুরুর পর্যায়ের অধিকাংশ সাদা কলারের পেশা বিলীন হয়ে যেতে পারে। তবে এই দাবির সপক্ষে এখন পর্যন্ত অকাট্য কোনো প্রমাণ নেই। বর্তমানে কিছু প্রাথমিক পেশায় এআইয়ের প্রভাব দেখা গেলেও তা অত্যন্ত সীমিত ও অসম। পুরো অর্থনীতিতে ব্যাপকভাবে চাকরি হারানোর কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। এআই সাক্ষরতা: পাঞ্জাবের দৃষ্টান্ত থেকে বাংলাদেশ যা শিখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের সংস্পর্শে থাকা কাজের কারণে সামগ্রিক কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। যেসব পেশায় এআইয়ের প্রভাব তুলনামূলক বেশি, সেখানে তরুণদের কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত হারের চেয়ে ১৯ শতাংশ কম। তবে এটি কেবল ছাঁটাইয়ের কারণে ঘটছে না, বরং নতুন নিয়োগ কমে যাওয়াও এর বড় কারণ। ২০২২ সাল থেকেই এআইনির্ভর পেশাগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ের নিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, যার কারণ হতে পারে সুদের হার বৃদ্ধি কিংবা মহামারির পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস। এসব পেশায় তাঁদের কর্মসংস্থান তুলনামূলক কম এআইনির্ভর খাতে কর্মরত তরুণদের হারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললে যতটা হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে ১৯ শতাংশ কম। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, ডিজিটাল মাধ্যমে সরবরাহযোগ্য সেবার ওপর বেশি নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলো কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০২৪ সাল থেকে নতুন কর্মীর চাহিদা কমলেও, অন্যান্য খাতে প্রযুক্তিকর্মীর চাহিদা এখনো বেশ জোরালো। যেসব ক্ষেত্রে এআই মানুষের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে, সেখানে কর্মসংস্থান হয় স্থিতিশীল রয়েছে, নতুবা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার সামগ্রিক বেকারত্বের ব্যবধানের তুলনায় কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে সব এআই-সংশ্লিষ্ট চাকরি ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি চালুর পর উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এআইয়ের মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে থাকা পেশার চাকরির বিজ্ঞপ্তি কম ঝুঁকিপূর্ণ পেশার তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। এশিয়ার দেশভেদে এই প্রভাব ভিন্ন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তরুণদের কর্মসংস্থান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে হ্রাস পেয়েছে, বিপরীতে পঞ্চাশোর্ধ্ব কর্মীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে। তবে এই পরিবর্তনের পেছনে জনমিতিক বা অর্থনৈতিক কারণও থাকতে পারে। এআই এশিয়ার শ্রমবাজারকে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বদলে দেবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আসিয়ানের মোট কর্মসংস্থানের ২২ দশমিক ৯ শতাংশ এমন পেশায় ছিল, যা প্রজন্মগত এআইয়ের প্রভাবের আওতায় পড়ে। তবে এর মধ্যে সর্বোচ্চ ঝুঁকির পেশায় নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও তরুণদের কর্মসংস্থানের গতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজার ভেঙে পড়ার কোনো প্রমাণ নেই।
চীনে দ্রুত এআই প্রয়োগের ফলে ট্যাক্সিচালক থেকে শুরু করে সাদা কলারের পেশাজীবীদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে দেশটিতে উচ্চ যুব বেকারত্বের সমস্যাটি এআইয়ের উত্থানের অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, যার পেছনে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতের দুর্বলতা বিদ্যমান। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা খাতে ঝুঁকি বেশি কেন্দ্রীভূত। যদিও শিল্পনেতারা ব্যাপক ছাঁটাইয়ের কথা অস্বীকার করছেন, তবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মীসংখ্যা কমেছে।
জাপানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। দেশটিতে বয়োজ্যেষ্ঠ জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে। সেখানে এআইকে চাকরির হুমকি হিসেবে না দেখে সমাধানের অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সেখানে কর্মী ছাঁটাইয়ের চেয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কর্মীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এশিয়ায় তরুণদের সক্ষমতা বাড়াতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই দক্ষতার পাশাপাশি বিশ্লেষণী চিন্তা, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও দলগত কাজের মতো দক্ষতা শেখানো জরুরি, যা সহজে স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব নয়। এআই যেন শিক্ষার বিকল্প না হয়ে শিক্ষার পরিপূরক হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরির জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ অপরিহার্য। শেষ পর্যন্ত, এআইয়ের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তরুণদের যথাযথ দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। এই বিশ্লেষণটি করেছেন কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ লি জং-হোয়া। শক্তিশালী শ্রমবাজার প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর অর্থনৈতিক নীতিও প্রয়োজন।

















