সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে বিনামূল্যে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি স্কুল ড্রেস, জুতা, মোজা ও ব্যাগ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রোববার দুপুরে সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, শিক্ষার্থীপ্রতি বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৫০ টাকা ব্যয়ের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্কুল ড্রেসের জন্য ৬০০ টাকা, ব্যাগের জন্য ৬০০, জুতায় ৭০০ এবং মোজার জন্য ৫০ টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। তবে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কেনাকাটার সময় এই ব্যয় আরও কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা থাকবে। রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এসব কথা বলেন। এটি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ব্যয়; দরপত্রের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এই পুরো কার্যক্রমটি পাঁচ বছর মেয়াদি ‘প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫)’ প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত হবে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা থেকে আসবে। তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের ব্যয় পর্যালোচনার মাধ্যমে পূর্বের পরিকল্পনা থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে। পিইডিপি-৪ গত জুন মাসে সমাপ্ত হওয়ার পর জুলাই থেকে এই নতুন কর্মসূচি চালুর কথা ছিল। পিইডিপি-৫ প্রকল্পের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমে প্রকল্পটির ব্যয় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ধরা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা ও সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। পিইডিপি-৪ গত জুনে শেষ হয়েছে।
উপকরণ সরবরাহের মান নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ ও বিটিএমএসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বাটা ও অ্যাপেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ হাজার জুতা এবং অন্যান্য সংস্থা প্রায় দুই লাখ ইউনিফর্ম সরবরাহ করেছে। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, এক কোটির বেশি শিক্ষার্থীর জন্য সঠিক মাপ ও মান নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই তাড়াহুড়ো করে ত্রুটিপূর্ণ পণ্য দেওয়ার চেয়ে সতর্কতার সাথে মান নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। প্রথম বছর সব উপকরণ দেওয়া সম্ভব না হলেও, পরবর্তী বছর থেকে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই এগুলো বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রয়োজনীয়তা ও হিসাব বিবেচনা না করে এ ব্যয়কে অপচয় বলা ঠিক হবে না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ফল নিতে এসে পরবর্তী বছরের বই নিয়ে যেতে পারবেন। তাড়াহুড়া করে ত্রুটিপূর্ণ উপকরণ দিতে চান না তারা।
আগামী ২৪ ডিসেম্বর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন থেকেই প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই দেওয়া হবে। তবে ড্রেস ও অন্যান্য উপকরণের জন্য বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন থাকায় তা পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে বিতরণ করা হবে। এছাড়াও প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই খাতে পাঁচ বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি কর্মীর মাসিক বেতন সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে বিদ্যালয়ের শৌচাগার ও সামগ্রিক পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, চার থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের কাছ থেকে সব সময় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সচেতনতা আশা করা যায় না। শিক্ষকদের দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করানো কিংবা শিক্ষার্থীদের অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবহারে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়।
মিড-ডে মিল কর্মসূচি নিয়েও নতুন পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
বর্তমানে ১৫০টি বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রম চলছে এবং তা পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জানান, রান্না করা খাবার কিংবা কুপন পদ্ধতির যেকোনো একটি বেছে নেওয়া হবে। শিশুদের দৈনিক পুষ্টির চাহিদার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নিশ্চিত করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এজন্য প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাছ, মাংস, ডিম ও সবজি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই দুই পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর ফলাফল যাচাই করে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

















