সড়ক দুর্ঘটনার নিষ্ঠুরতা এখন কেবল ব্যক্তিগত শোকের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আস্ত পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গত ৬ বছর ১০ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০০টি পরিবার পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুরো পরিবারে এমন কোনো স্বজন অবশিষ্ট নেই যারা নিহতদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করবে। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সহায়তায় অনেক সময় শেষ বিদায়ের আয়োজন করতে হয়। দুর্ঘটনার পর তাঁদের সৎকারের জন্য নিকটাত্মীয় খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। আগের দিনও এই মাঠে তাঁরা হাসি–আনন্দে সময় কাটিয়েছেন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে। তবে শুধু একসঙ্গে যাতায়াতকে দায়ী করার সুযোগ নেই।
এর ভয়াবহতা কতটা গভীর, তা বোঝা যায় ২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের মূলকান্দিতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায়। সেদিনের সড়ক দুর্ঘটনায় টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চাষাভদ্রা গ্রামের এক পরিবারের পাঁচজন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন হরেকৃষ্ণ বাদ্যকর (৫৫), তাঁর ছেলে গোবিন্দ বাদ্যকর (২৮), পুত্রবধূ ববিতা বাদ্যকর (২৫), নাতনি রাধে বাদ্যকর (৪) এবং আত্মীয় রামপ্রসাদ বাদ্যকর (৩০)। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যসহ শিশু ও নারীদের মৃত্যুতে অবশিষ্ট স্বজনদের জীবন এক অনিশ্চিত সংকটে পড়ে যায়। ফলে পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামোও ভেঙে পড়ে। খাটিয়াগুলোর চারপাশে তখনো থামছে না স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের দীর্ঘশ্বাস। তিনজন ১৫টি, চারজন ৯টি, পাঁচজন সাতটি ও আটজন তিনটি দুর্ঘটনায়।
সর্বশেষ গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে জামালপুর–দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের মেলান্দহ উপজেলার বুরুঙ্গা এলাকায় অটোরিকশায় ট্রাকচাপায় শিক্ষক দম্পতিসহ চারজন নিহত হন। এই দম্পতি মাহমুদপুর হারুনুর রশিদ ইসলামী কমপ্লেক্সের শিক্ষক ছিলেন। নিহতরা হলেন মোরশেদ আলম (২৪), তাঁর স্ত্রী ইকরামা (১৯) এবং তাদের সাত মাস বয়সী কন্যাসন্তান রিফা। মোটরসাইকেলের চালক লিখন আকন্দও (৩২) সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে ইকরামার চাচা ইদ্রিস আলী আর্তনাদ করে বলেন, তাদের পরিবারে আর কেউ অবশিষ্ট রইল না। এক শিক্ষক দম্পতির জন্য খাটিয়া দুটি রাখা হয়েছে। মাঠের এক কোণে এ দম্পতি ও তাঁদের সাত মাস বয়সী একমাত্র কন্যাসন্তানের শেষ গোসল দেওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া নিহত মোটরসাইকেলের চালকের নাম লিখন আকন্দ (৩২)।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অটোরিকশায় ভ্রমণের সময় পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ২১১টি দুর্ঘটনায়। এছাড়া মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় ৪৮টি, প্রাইভেট কারে ৩৪টি এবং অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় অন্তত ১১টি ঘটনায় পরিবারের একাধিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়ও স্বামী–স্ত্রী ও বাবা–সন্তানের একত্রে প্রাণহানির অগণিত নজির রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় ৪৫টি বড় দুর্ঘটনায় ১৬২ জন এবং বাস দুর্ঘটনায় ৪৩টি বড় দুর্ঘটনায় ৮৫ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এক দিনের ব্যবধানে সেখানে চলছে শেষবিদায়ের প্রস্তুতি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৫ জন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, এই ৩০০ পরিবারের সংখ্যাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা। বাস্তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান করলে এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানান, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যু শুধু প্রাণহানির পরিসংখ্যান বাড়াচ্ছে না, বরং এটি একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসে বেশি প্রাণহানি। তাঁরা নিজেরা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে বা পরিবারগুলোর তথ্য অনুসন্ধান করে এই সংখ্যা যাচাই করেননি।
সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হওয়ার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান এবং এটি আমাদের সড়ক ব্যবস্থার চরম অনিয়মের প্রতিফলন। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা একটি জটিল ব্যাধি, কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণে সরকার যেসব পদ্ধতি নিচ্ছে তা একমুখী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত নয়। একেক দুর্ঘটনার ধরন একেক রকম হওয়ায় সব ক্ষেত্রে একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হয় না। সব দুর্ঘটনার ধরন এক নয়, একে নিয়ন্ত্রণে পদ্ধতিও এক হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কে অটোরিকশার অবাধ চলাচল, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের বেহাল দশা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং চালকদের অদক্ষতা ও দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীন গাড়ি চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহারে অনীহা এবং বেপরোয়া গতির প্রবণতা। মোটরসাইকেল চালানোর সময় মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা, বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
সড়ক নিরাপত্তার উন্নয়নে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বেশ কিছু সুপারিশ করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে মহাসড়কে রোড ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণ, যানবাহনের নিয়মিত গতি নজরদারি এবং গ্রামীণ সড়কের সাথে মহাসড়কের সংযোগ নিরাপদ করা।
এছাড়া চালকদের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ সময় বিরতিহীন গাড়ি চালানো বন্ধ করা জরুরি।
সংস্থাটির মতে, সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু ঠেকানো কঠিন হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর বিষয় নয়, এটি প্রতিটি পরিবারের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।

















