দৈনন্দিন জীবনে মুঠোফোন ছাড়া একটি মুহূর্তও কল্পনা করা কঠিন। যোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যাংকিং—সবকিছুর জন্যই আমরা ফোনের ওপর নির্ভরশীল। তবে পুরুষেরা নিয়মিত প্যান্টের সামনের পকেটে মুঠোফোন রাখেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারতের ডেম হেলথ-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং রিনিউ হেলথ কেয়ারের স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. রাজীব আগরওয়াল বলেন, এ বিষয়ে আতঙ্কিত হওয়া যেমন অযৌক্তিক, তেমনি বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়। গবেষণার তথ্যের আলোকে বিষয়টি সতর্কতার সাথে বোঝা প্রয়োজন। চাকরি, যোগাযোগ, ইন্টারনেট, দরকারি তথ্য কিংবা ব্যাংকিং লেনদেন—বলতে গেলে ফোন ছাড়া আমরা অচল। প্যান্টের সামনের পকেটে মুঠোফোন রাখলে ফোনটি অণ্ডকোষের খুব কাছাকাছি অবস্থানে থাকে।
মুঠোফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির প্রভাবে শুক্রাণুর গতিশীলতা ও কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে ১৮টি গবেষণার একটি বড় বিশ্লেষণ হয়েছে, যেখানে ৪ হাজারের বেশি বীর্যের নমুনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মুঠোফোনের বিকিরণ শুক্রাণুর কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে। শরীরে ফ্রি র্যাডিকেল ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের ভারসাম্যহীনতাই হলো অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, যা শুক্রাণুর কোষের ক্ষতি করে। এছাড়া ফোন থেকে উৎপন্ন তাপ অণ্ডকোষের তাপমাত্রা বাড়িয়ে শুক্রাণু উৎপাদনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করতে পারে বলে অনেক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৮টি গবেষণা ও ৪ হাজারের বেশি বীর্যের নমুনা একত্রিত করে করা একটি বিশ্লেষণও আছে।
তবে ডা. আগরওয়ালের মতে, গবেষণাগারের পরীক্ষার ফলাফল এবং বাস্তব পর্যবেক্ষণের জরিপে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃত দম্পতিদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, পকেটে ফোন রাখার অভ্যাসের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণমান বা গর্ভধারণের সময়ের কোনো স্পষ্ট যোগসূত্র নেই। তাই এটিকে বন্ধ্যত্বের সুনির্দিষ্ট কারণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। তিনি জানান, অধিকাংশ ভীতিই ল্যাবরেটরির পরীক্ষা থেকে এসেছে, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে নয়। তবে এসবই গবেষণাগারে চালানো পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে।
এরপরও শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের অবনতিতে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। ডা. আগরওয়াল জানান, কো-এনজাইম কিউ টেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মাত্রা কমে এবং শুক্রাণুর সচলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এটি বিকিরণজনিত ক্ষতির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিষেধক না হলেও সামগ্রিক শুক্রাণুর স্বাস্থ্য উন্নত করতে কার্যকরী।
কেবল কো-এনজাইম কিউ টেন নয়, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং লাইকোপেনের মতো উপাদানগুলোও শুক্রাণুর মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে বলে র্যান্ডম ট্রায়ালে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে জিঙ্ক ও সেলেনিয়াম শুক্রাণুর ঘনত্ব এবং গঠন উন্নত করে, অন্যদিকে লাইকোপেন অক্সিডেটিভ ডিএনএ ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। এই বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতেই পুরুষদের প্রজননক্ষমতা বৃদ্ধির চিকিৎসা পদ্ধতি সাজানো হয়। ৮০ পেরিয়েও যাঁদের স্মৃতিশক্তি অসাধারণ, তাঁদের সবার মধ্যে একটাই মিল।
পরিশেষে, কোনো পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা কমে গেলে সরাসরি মুঠোফোনকে দায়ী করা ভুল হবে। প্রজনন সমস্যার পেছনে আরও জটিল ও ভিন্ন স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা এবং যথাযথ ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোনের ঘাটতি কেন হয়, কীভাবে বাড়ানো যায়। তবে শুক্রাণুর মোট সংখ্যা বা ঘনত্বের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি।

















