নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় মারণাস্ত্রের বদলে যুক্তি, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বাংলাদেশের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ছাত্র-জনতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আত্মত্যাগকারী সবার অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন তিনি। তিনি বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। পাশপাশি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানান তিনি। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, গ্লোবালাইজেশনের যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তে ঘটা ঘটনার প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়ে। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে ভয়াবহ চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে মানবিক সংকট তৈরি করেছে। তিনি বিবদমান দেশগুলোকে সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব সমাজ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং কূটনীতি ও মানবতাই পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্লোবালাইজেশনের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানব সৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
স্মৃতিকাতর প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করেন, যারা অতীতে এই একই বিশ্বমঞ্চে দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলেছিলেন। তিনি জানান, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি এই ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন, যা জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি’র লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে ১২ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যেহেতু সংকটের উৎস মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও সেখানেই খুঁজতে হবে। পাশাপাশি অভিবাসীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সব সময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি জানান।
পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তারেক রহমান জানান, আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং ডিজিটাল বিভাজন দূর করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসারের সুফল যাতে সব দেশ পায়, সেজন্য জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরে সরকার কাজ করছে। বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশকে টেকসই সহায়তা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এবং একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশ গড়তে বর্তমান সরকার সব ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

















