ঢাকার রায়েরবাজারের শেরে বাংলা রোডের পাশে মোহাম্মদীয়া আলিম মাদ্রাসার গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটি শতাব্দীপ্রাচীন জরাজীর্ণ দালান। অযত্নে পড়ে থাকা এই ভবনের গায়ে লাগানো একটি কালো সাইনবোর্ডে সাদা রঙে লেখা রয়েছে—‘গদিঘর, স্থাপিত ১৯১৮ ইং’। তেরো শতক জমির ওপর নির্মিত এই ভবনের দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থে ৩০ ফুট। লোনা ধরা দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা আর শেওলা জমে থাকা এই স্থাপনাটি যেন এক নীরব ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে ভবনটি দেখভাল করছে স্থানীয় ‘বৈশাখী যুব সংগঠন’, যারা এখানেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন জানান, গত পয়লা বৈশাখ তারা এই মাঠেই আয়োজন করেছিলেন এবং ভবিষ্যতে এখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। তবে বর্তমানে স্থানীয়রা এই স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা গদিঘর দেখতে গিয়েছিলেন তৌহিদুল ইসলাম। নামটি হয়েছে শতাধিক বছরের পুরোনো একতলা একটি ভবনকে কেন্দ্র করে। সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে বা রিকশায় যাওয়ার পথে পুরোনো স্থাপনাটির দিকে তাকিয়েছি বহুবার। কিন্তু মোহাম্মদীয়া আলিম মাদ্রাসা গলির মুখের পাশে শেরে বাংলা রোড–লাগোয়া ভবনটিতে কোনো নামফলকই নেই। মাঠ-সংলগ্ন পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে কয়েকটি বড় বড় গাছ। এসব গাছের ছায়ায় ভাদ্রের ভরদুপুরেও প্রাঙ্গণটি বেশ স্নিগ্ধ-শীতল। ১৩ শতক জমির দক্ষিণ অংশে মাঠ, উত্তর অংশে গদিঘর ভবন। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে আছে শৈল্পিক নকশা। দিনের বিভিন্ন সময় শিশু-কিশোরেরা মাঠে খেলাধুলা করে। মাঝেমধ্যে রাতের বেলায় ক্রিকেটও খেলেন স্থানীয় তরুণ-যুবকেরা। খালের ওপরই গড়ে উঠেছে সাদেক খান রোডের একাংশ। বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসিসহ নানা তৈজসপত্র নিয়ে এই ঘাটে এসে ভিড়ত ছোট–বড় নৌযান। দ্রুত এই এলাকার ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়।
গদিঘরের পেছনের ইতিহাসের সূত্রপাত ১৮৭৬ সালে, যখন মৃৎশিল্পের বাণিজ্যের প্রসারে ‘রায়েরবাজার পাল সমিতি ট্রাস্ট’ গঠিত হয়। তৎকালীন সাবডিভিশনাল অফিসার খানবাহাদুর সৈয়দ আবদুল লতিফের পরামর্শে মহেশ কুমার মজুমদার, অভয়াকুমার দত্ত, তালুকদার শেখ জাফর আলী মণ্ডল ও কিশোরীমোহন পালের নেতৃত্বে ট্রাস্টটি পুনর্গঠিত হয়। সেই কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই ১৯১৮ সালে এই গদিঘর ভবনটি নির্মাণ করা হয়। একসময় রায়েরবাজারের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের নৌঘাট দিয়ে মৃৎশিল্পের পণ্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ত। এখান থেকে ট্রাস্টের মাধ্যমে টোল আদায় হতো এবং সেই অর্থ দিয়ে মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জনকল্যাণমূলক কাজ করা হতো, যা হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল। অনেকের মতো সেই তাকানোর মধ্যে ছিল একরাশ কৌতূহল। দালানের পেছনের অংশে ভঙ্গুর দেয়ালে গজিয়েছে পরগাছা ও লতাগুল্ম। সেই সঙ্গে বাড়ে ট্রাস্টের অর্থনৈতিক সক্ষমতা।
তবে এই সম্প্রীতির স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি রক্তাক্ত সময়। ১৯৬৪ সালে রায়েরবাজারের স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর দাঙ্গাকারীরা হামলা চালায়। দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী বিশ্বনাথ পাল, যিনি বর্তমানে রায়েরবাজার শ্রীশ্রী মহাপ্রভু আখড়া মন্দিরের সভাপতি, জানান যে সে সময় গদিঘরসহ পুরো এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছিল। বিহারিদের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে জিন্নাত আলী ও মাহেন্দ্র পাল প্রাণ হারান। জিন্নাত আলীর স্ত্রী ফুলনেছা বিবিও দাঙ্গাকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে ১১ দিন পর মারা যান। কবি জসীমউদ্দীন তার ‘জীবন কথা’ বইয়ের উৎসর্গপত্রে জিন্নাত আলীর এই ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। জীর্ণ দালানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রায়েরবাজারের জমজমাট মৃৎশিল্পের বাণিজ্য, মানবকল্যাণকর নানা উদ্যোগ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গল্প আর একটি রক্তাক্ত সময়ের স্মৃতি। শেষে কৌতূহল আর ধরে রাখতে না পেরে ১১ সেপ্টেম্বর সশরীর গিয়ে হাজির হই। ১৯৬৪ সালে রায়েরবাজার এলাকার হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায় এবং মোহাম্মদপুর এলাকার অবাঙালি বিহারি সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা লাগে। এই দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা ও রায়েরবাজার শ্রীশ্রী মহাপ্রভু আখড়া মন্দিরের সভাপতি ৮১ বছর বয়সী বিশ্বনাথ পাল।
জিন্নাত আলীর নাতি মাহি বি সিনহার মতে, তাঁর দাদা সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন, আর গদিঘর হলো সেই আত্মত্যাগের জ্বলন্ত প্রতীক। বর্তমান ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক সুখেন পাল আক্ষেপ করে বলেন, ট্রাস্টের অনেক সম্পদই এখন বেহাত হয়ে গেছে, যা পুনরুদ্ধারে আদালতে মামলা চলছে। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গদিঘরটি মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এরশাদ সরকারের পতনের পর সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ভবনটি ভেঙে বহুতল নির্মাণের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কাছে গিয়ে দেখা যায় দখিনদুয়ারি দালানটি জরাজীর্ণ। ছোট প্রাঙ্গণটির এক পাশে পাকা বারান্দায় ক্লান্ত পথচারী কিংবা শ্রমজীবী মানুষকে প্রায়ই বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। পশ্চিমে পুরোনো বুড়িগঙ্গা আর উত্তরে তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছিল সেই খাল। দীর্ঘদিন ভালোভাবে চলার পর একপর্যায়ে দ্বন্দ্ব ও মামলা-মোকদ্দমায় ট্রাস্টের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে।
গদিঘর রক্ষার বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সাবিনা আলম জানান, সরকারিভাবে সংস্কারের জন্য স্থাপনাটিকে প্রথমে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংরক্ষণযোগ্যতা যাচাই এবং জেলা প্রশাসনের মতামত নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। স্থানীয় সচেতন মহল ও যুবসমাজের দাবি, অবিলম্বে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে সরকারি আওতায় এনে সংস্কারের মাধ্যমে একটি পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করা হোক, যাতে এটি হারিয়ে না যায়।

















