যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে দেশটিতে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতির হাওয়া নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর রাজনৈতিক চাপ ও নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সেখানে কোনো মুসলিম প্রার্থী নির্বাচনে না থাকলেও মুসলিম ভোটাররা এই নির্বাচনকে তাদের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে মুসলিম প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণায় বিদ্বেষের বিষয়টি সামনে এসেছে। মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের মতো নেতারা এর অন্যতম উদাহরণ। সেখান থেকে পাওয়া ধারণার কারণে শিশুরাও একে অপরকে নানা অপ্রীতিকর কথা বলে।’। তবে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত এই অঙ্গরাজ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতিগত পদক্ষেপ যেভাবে বেড়েছে, তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনো কেউ সরকারে মুসলিম আইন চাপিয়ে দেয়নি।’।
আইনজীবী সামির নাজজাম বলেন, তিনি সরাসরি নিজের সন্তানদের মাধ্যমে এই ইসলামবিদ্বেষের প্রভাব অনুভব করছেন। গত ৩ নভেম্বর ভোটের কয়েক দিন আগে হিউস্টনের একটি ইসলামিক সেন্টারের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, প্রাপ্তবয়স্কদের মেলামেশা পছন্দের বিষয় হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির জটিলতা অনেক বেশি। মুসলিমদের রাজনৈতিক স্বার্থে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চান তারা। তাদের মতে, রাজনীতিতে মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার প্রভাব পড়ছে পরিবার, সন্তান এবং দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে। ৪৫ বছর বয়সি এই আইনজীবী বলেন, রাজনীতিতে মুসলিমবিদ্বেষের প্রভাব তিনি সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নিজের সন্তানদের মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের পছন্দমতো মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারেন। তবে এবার ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের শক্তি দেখাতে চান সম্প্রদায়টির সংগঠকরা। ইসলামের ধর্মীয় রীতিনীতি ও বিধিবিধানকে বোঝাতে ব্যবহৃত এই শব্দকে তারা টেক্সাসের মানুষের জন্য আসন্ন হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন বলে অভিযোগ মুসলিমদের।
হিউস্টনের ৩০টিরও বেশি মসজিদের তদারককারী ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার হিউস্টনের সভাপতি এমরান গাজী জানিয়েছেন, মুসলিমদের সব ক্ষেত্রে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। সংগঠনটি ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং জুমার নামাজের সময় মুসল্লিদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাদের মূল দাবি, যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনীতিবিদরা যেন মুসলিম সম্প্রদায়ের কথা বিবেচনায় রাখেন। আমি চাই না আমার সন্তানকেও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হোক।’। এতে শরিয়াহ আইনের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তি, সরকারি চাকরি, সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কাজের অযোগ্য ঘোষণা, নাগরিকত্ব বাতিল এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর টেক্সাসে মুসলিমদের জন্য বিশেষ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং স্বেচ্ছায় ইসলামি সালিশ পরিচালনাকারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ ধরনের স্বেচ্ছামূলক সালিশব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে।
চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদ পরিস্থিতির অসহনীয় অবস্থার কথা বর্ণনা করে বলেন, গত দুই বছরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কথাও ভেবেছেন। নিজের সন্তানকে সমাজের চোখে সন্ত্রাসী হিসেবে দেখার আশঙ্কা তাকে কুঁকড়ে দিচ্ছে। তিনি জানান, মুসলিমদের মধ্যে অনেকে মনে করেন বিদ্বেষ মোকাবিলার সেরা উপায় চুপ থাকা, কিন্তু এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য ভোট দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ৪২ বছর বয়সি চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদ বলেন, ‘সত্যি বলতে, পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে এমনও ভেবেছি, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েই চলে যাব।’। সম্প্রতি হিউস্টনে বসবাস শুরু করা ৩৩ বছর বয়সি চিকিৎসক সারাহ দাব্বাস বলেন, ‘বাস্তব জীবনে সবাইকে যেভাবে দেখানো হচ্ছে, মানুষ আসলে ততটা বিদ্বেষী নয়।
টেক্সাসের রাজনীতিতে গত কয়েক মাসে ‘শরিয়াহ আইন’ বিরোধী প্রচারণা তীব্র হয়েছে। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং রিপাবলিকান পার্টির নীতিনির্ধারকরা বারবার দাবি করছেন, তারা টেক্সাস থেকে শরিয়াহ আইন পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করবেন। এমনকি গত জুনে ‘ডোন্ট শরিয়াহ মাই টেক্সাস’ শিরোনামে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়। শুধু তাই নয়, ১৫০ সদস্যের রাজ্য আইনসভায় ৩৮ জন সদস্য নিয়ে ‘শরিয়াহ-ফ্রি টেক্সাস ককাস’ নামে একটি জোটও গঠিত হয়েছে। গত মাসে ডালাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান মিডটার্ম কনভেনশনে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট বলেন, ‘আমরা ওয়াশিংটন ডিসির জন্য অপেক্ষা করছি না। ১৫০ সদস্যের রাজ্য আইনসভায় ইতোমধ্যে এই জোটে ৩৮ জন সদস্য যুক্ত হয়েছেন। কংগ্রেসে এই জোটের সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও শরিয়াহ আইন চালু না থাকলেও রাজনীতিবিদদের এমন প্রচারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ’ জানিয়েছে, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা মুসলিমদের সাধারণ নাগরিক কর্মকাণ্ড, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সমাজসেবামূলক কাজকেও ইসলামি আইনের হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বড় করে দেখাচ্ছেন।
তারা মুসলিমদের অস্তিত্বকেই একটি বড় ঝুঁকির বিষয় হিসেবে দেখাচ্ছেন।
শুধু ডেমোক্র্যাট সমর্থক নন, রিপাবলিকান পার্টির আদর্শে বিশ্বাসী মুসলিমরাও এখন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে বিদায়ী চেয়ারম্যান আব্রাহাম জর্জের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। এমনকি রিপাবলিকান দলীয় প্রতিনিধি তারেক হোসেনের পরিবারের সদস্যকেও নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের পরিবারের কেউ কেউ নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম দেখে।
গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট কেয়ার (CAIR) টেক্সাসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটি গভর্নর ও অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের দাবি, এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে থাকা বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রিপাবলিকান মুসলিম জানান, দীর্ঘদিন ধরে পার্টির ব্যবসায়িক ও পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে একমত থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক রক্ষণশীল মুসলিম ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। তাদের মতে, দল-মত নির্বিশেষে মুসলিমরা এখন একটি বার্তা দিতে চান যে, কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডায় তাদের ভয়ের উৎস বানানো যাবে না।
স্থানীয় সংগঠক সানিয়া রহিম জানান, টেক্সাসের মুসলিম সম্প্রদায় অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তবে ভাষা ও জাতিগত পার্থক্যের কারণে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাটা চ্যালেঞ্জিং। তবুও তারা মনে করেন, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণই হতে পারে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের প্রধান উপায়। এটি বন্ধ করতে আমাদের এখনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’।

















