প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ এক শিক্ষার্থী সাজিয়া শাহারিয়ার ছোঁয়া। মোরেলগঞ্জ উপজেলার সুরেন্দ্রনাথ স্মৃতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। বিদ্যালয়টির ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সাজিয়া। সোমবার সকালে মা সুরাইয়া জাহানের সঙ্গে ইজিবাইক ও ভ্যান বদলে সুদূর মোরেলগঞ্জ থেকে বাগেরহাটের স্বাধীনতা উদ্যানে পৌঁছায় সে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই মেধাবী মেয়ের স্বপ্ন প্রকৌশলী হওয়ার। নিজের লক্ষ্য পূরণে সে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি পত্রিকার নিয়মিত পাঠক হয়ে উঠেছে এবং শিখোর অনলাইন কোর্সেও অংশ নিচ্ছে। মেয়ের এই সাফল্যে উৎসাহিত করতে মা সুরাইয়া জাহান তাকে নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই অনুষ্ঠানে এসেছেন। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মেয়েকে নিয়ে অনুষ্ঠানে আসার কারণ জানতে চাইলে মা সুরাইয়া জাহান বলেন, ‘আমাদের এলাকাটা বেশ প্রান্তিক। খুলনার সরকারি পাইওনিয়ার মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছে সাজিয়া। সাজিয়াদের বাড়ি মোরেলগঞ্জ উপজেলার তেলিগাতী ইউনিয়নের হেড়মা বাজার এলাকায়। সেখান থেকে মেয়েকে নিয়ে এসেছি, ওকে উৎসাহ দিতে।
সকাল গড়িয়ে আসতেই বাগেরহাটের স্বাধীনতা উদ্যান মুখর হয়ে ওঠে কৃতী শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। দীর্ঘ সময় পর সহপাঠীদের কাছে পেয়ে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও সেলফিতে মেতে ওঠে তারা। ফকিরহাটের শিরিন হক পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া মৌলি বিশ্বাস, জয়া আক্তার, আফিয়া ফারজানা, আনিকা তাবাসসুম পিয়া, আফিয়া জান্নাত ও ঈশিতার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল বাগেরহাট সদরের রহিমাবাদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিনিয়া আক্তার। বন্ধুত্বের এই আনন্দঘন মুহূর্তগুলো ছিল অনুষ্ঠানের বাড়তি পাওয়া।
আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে ২০২৬ সালের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য এই সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। দেশব্যাপী ৬৪ জেলায় আয়োজিত এই কর্মযজ্ঞের বাগেরহাট পর্বটি ছিল প্রাণবন্ত। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। বাগেরহাট বন্ধুসভার বন্ধু শহিদুল ইসলাম ইমনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রতিনিধি সরদার ইনজামামুল হক। আয়োজনে পাওয়ারড বাই হিসেবে ছিল বিকাশ এবং সহযোগী হিসেবে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও বন্ধুসভা। একদিন আগে গ্রামের বাড়ি ফিরে মাকে নিয়ে আজ বাগেরহাটে এসেছে শিখো– জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। ওদের জন্য এমন আয়োজন সত্যিই খুব দরকার।
অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মকে দেশের ভবিষ্যৎ রূপকার হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক চৌধুরী আবদুর রব বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা, ১৯৯১ সালের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ২০২৪ সালের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণদের অবদান অপরিসীম। তিনি শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেন যে, এখনো কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার কাজ বাকি এবং সেই দায়িত্ব তরুণদেরই কাঁধে তুলে নিতে হবে।
নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে চিকিৎসক ও ভ্রমণকন্যা প্ল্যাটফর্মের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডা. সাকিয়া হক বলেন, জিপিএ-৫ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা অর্জনের পথে ধৈর্য ও অবিচল থাকা বেশি জরুরি। জিপিএ-৫ পাওয়ার আগের দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের সাফল্যের গল্প তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের শেষভাগে খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মণ্ডল শিক্ষার্থীদের শপথ পাঠ করান। তিনি উপস্থিত কৃতী শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থবিদ্যার মতো অন্ধকার দিকগুলোকে না বলার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল জিপিএ-৫ দিয়ে জীবনের সার্থকতা বিচার করা যায় না, একজন মানুষ হিসেবে সমাজ ও দেশ গঠনে তার ভূমিকা কেমন, সেটাই আসল পরিচয়।











