হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া বাজারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ ও একটি মন্দির। ঢাকা-সিলেট পুরোনো মহাসড়কের পাশে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দুর্গামন্দিরটির ঠিক ১০ ফুট ব্যবধানে ১৯৭৮ সালে গড়ে তোলা হয় কামাইছড়া চা-বাগান জামে মসজিদ। এই দীর্ঘ সময়ে দুই উপাসনালয়ের দরজা প্রায় মুখোমুখি থাকলেও এখানকার মানুষ একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। ধর্মীয় উৎসবগুলোতে দুই পক্ষ একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ভ্রাতৃত্বের অটুট বন্ধন তৈরি করেছে। মাঝখানে দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট, দরজাও প্রায় মুখোমুখি। এর প্রায় ১৯ বছর পর ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কামাইছড়া চা-বাগান জামে মসজিদ। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এমন চমৎকার চিত্র দেখা গেছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া বাজার এলাকায়। আশা করি, আমাদের এই সৌহার্দ্য ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে।
কামাইছড়া চা-বাগান জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুর রহিম জানান, গত ৫০ বছর ধরে পূজা কমিটির সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে কখনোই কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গোপাল গোয়ালা জানান, পারস্পরিক সৌহার্দ্যের নিদর্শন হিসেবে পূজার সময় মুসলমানরা মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেন, তেমনি ঈদের সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও মসজিদের সীমানাপ্রাচীর সংস্কার ও রং করার কাজে সহায়তা করেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে আমরা পূজা কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। এমনকি পূজা উপলক্ষে রং করা হয় মসজিদের সীমানা প্রাচীর, আবার ঈদ এলে রং করা হয় মন্দিরের সীমানা প্রাচীরও।
দুই পক্ষের এই সমঝোতার কারণে কোনো উৎসবই অন্যটির উপাসনায় বিঘ্ন ঘটায় না। দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান চলার সময় আজান বা নামাজের সময় হলে পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সব বাদ্যযন্ত্র ও অনুষ্ঠান বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষ হওয়ার পর পুনরায় পূজার কার্যক্রম শুরু হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, এই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় সহনশীলতা দেশজুড়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। একদিকে ভেসে আসে আজানের সুর ও নামাজের তাকবির, অন্যদিকে চলে পূজার্চনা।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে কামাইছড়ার এই মসজিদ ও মন্দিরটি পাশাপাশি অবস্থান করে সম্প্রীতির যে নজির স্থাপন করেছে, তা দেশের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ ছাড়া কামাইছড়া পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন স্থানীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। ১০ ফুটের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই উপাসনালয় বর্তমানে কেবল ইবাদত ও প্রার্থনার জায়গা নয়, বরং ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবতার এক আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১০ ফুটের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকা এ দুই উপাসনালয় কেবল ধর্মীয় ক্ষেত্র নয়, বরং মানবতা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সহনশীলতার এক আলোকবর্তিকা হয়ে বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে পুরো বাংলাদেশে।












