সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও চাকরি বিক্রির এক বিশাল নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘ তদন্ত শেষে এই ঘটনায় ৫৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন কুমার সাহা। গত ১৮ মে আদালতে জমা দেওয়া এই চার্জশিটে নিয়োগ জালিয়াতির নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে পিএসসির ভেতর থেকে প্রশ্ন চুরি এবং বিজি প্রেস থেকে তা বাইরে আনার কৌশল বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা চেক করে ক্লিয়ারেন্স দিলে জমা দেবেন।’।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জালিয়াতি চক্রের মূল সমন্বয়ক ছিলেন পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী। ১৯৯৭ সালে পিএসসিতে যোগ দেওয়ার পর তৎকালীন চেয়ারম্যানদের গাড়ি চালানোর সুযোগ নিয়ে তিনি দপ্তরের ভেতরের দুর্বলতাগুলো আয়ত্ত করেন। ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে টাকার বিনিময়ে চাকরি দিয়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। সিআইডি আবেদ আলীর নিজের ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের ১২টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৪১ কোটি ২৯ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে বর্তমানে ২৫ জন জামিনে আছেন এবং ২৯ জন পলাতক রয়েছেন। উত্তরে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘বৃষ্টি পড়ে, ফ্রি হয়ে কথা বলব। প্রতিটি আবেদন রেডি করে জমা দেওয়ার এক দিন পূর্বে পিডিএফ করে পাঠাবেন।
প্রশ্নপত্র চুরির সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, যখন পিএসসির অফিস সহায়ক মো. সাজেদুল ইসলাম রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতিয়ে নেন। সাজেদুল পিএসসির এক কর্মকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে ঝাড়ুদারের কাছ থেকে চাবি নিয়ে চেম্বারে ঢুকে হ্যাকসো ব্লেড দিয়ে ট্রাংক কেটে প্রশ্ন চুরি করেন। এরপর ঢাকার বিভিন্ন কম্পিউটার দোকানে গিয়ে তা কম্পোজ করে পরীক্ষার দুই দিন আগে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। রেলওয়ের ওই পরীক্ষায় ৪৪ জন প্রার্থীকে পাস করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি প্রায় ৪ কোটি টাকা অগ্রিম নিয়েছিলেন। এছাড়া ৪৬তম বিসিএস ও পলিটেকনিকের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদেও তাঁর জালিয়াতির তথ্য মিলেছে।
অন্যদিকে, সরকারি বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন চুরির কাজটি করতেন বাঁধাইকর্মী মোহাম্মদ আকরাম হোসেন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মজনু মিয়া। মজনু মিয়া কৌশলে অন্তর্বাসে লুকিয়ে ছাপা হওয়া প্রশ্নপত্র বাইরে নিয়ে আসতেন। ২০১২ সাল থেকেই এই চক্রটি বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাচার করে আসছিল। এসব ফাঁস করা প্রশ্নপত্র পরে এ টি এম গোলাম মোস্তফা ও মিজানুর রহমানের মতো সহযোগীদের হাত দিয়ে বিপুল টাকার বিনিময়ে প্রার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।
তদন্তে উঠে এসেছে, হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনের মাধ্যমে চলত এই জালিয়াতির কারবার। সিআইডির উদ্ধার করা বার্তায় দেখা যায়, ‘ইব্রাহিম ভাই, ৫ তারিখের কাজ ১০০% কনফার্ম’ কিংবা ‘৫০ জন ক্লিয়ার হয়ে যাবে’—এমন নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো চাকরিপ্রার্থীদের। রিটেন পাস করার জন্য ৭ লাখ টাকা দাবির তথ্যও নথিতে স্পষ্ট। এছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে টাকা লেনদেনের হিসাব সংরক্ষণের জন্য চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে ডায়েরি ও নোট খাতা জব্দ করা হয়েছে। জবাব আসে, ‘এখন ৫০ জন ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আপনাকে কথা দিলাম, সব কটি কাজ আপনাকে ১০০/১০০ তুলে দেব। আগামী ২১ তারিখের মধ্যে সব টাকা ক্লিয়ার করতে হবে। ৩ তারিখে এই ছেলের ভাইভা পার করতে হবে। অপর পাশ থেকে নির্দেশ আসে, ‘আগামীকাল একটু সময় করে ভূমি রেকর্ড প্রার্থীর টাকা দিয়ে দিয়েন।
চক্রের আরেক সদস্য খলিলুর রহমান ২০০৫ সাল থেকে পিএসসিতে ডেসপাচ রাইটার হিসেবে কাজ করলেও ২০১২ সালে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। তবে ২০২২ সালে তিনি পুনরায় চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে আরও বড় পরিসরে জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর কাছ থেকে পাওয়া ডায়েরিতে প্রার্থীদের নাম, ফোন নম্বর ও লেনদেনের বিস্তারিত হিসাব পাওয়া গেছে। একইভাবে আতিকুল ইসলাম ও তাঁর ছোট ভাই মোজাহেদুল ইসলামও এই বাণিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়েন। মোজাহেদুল সরকারি চাকরিতে থেকেও নিজের নামে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে কোটি টাকার লেনদেন করতেন।
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এই ৫৫ জন আসামির মধ্যে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের পৃথক তদন্ত চলছে। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই পল্টন থানায় দায়ের করা এই মামলার পলাতক আসামিদের শনাক্তে আদালত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন, যা আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।

















