বর্তমান সময়ে প্রেমের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও জটিলতা কাটাতে জেন-জি বা নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা ভিন্নধর্মী কিছু চর্চার দিকে ঝুঁকছেন। ডেটিং নিউজ-এর এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্ক জেন-জি প্রজন্মের ৬৪ শতাংশ মানুষ ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পেতে বা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে জীবনে অন্তত একবার আধ্যাত্মিক, সাইকিক কিংবা জাদুবিদ্যার মতো পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। সোলমেট খুঁজে পেতে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি জাদুবিদ্যার প্রতিও কেন বাড়ছে আগ্রহ। ডেটিং অ্যাপে হতাশা, জাদুবিদ্যায় বাড়তি আগ্রহ। আধুনিক প্রেমের ক্ষেত্রে যোগাযোগের সুযোগ অনেক বেড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া যেসব জেন–জি পদ্ধতিগুলো চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করেছে। অর্থাৎ, আধ্যাত্মিক চর্চার প্রতি আগ্রহ থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাদার পরামর্শের গুরুত্ব তাঁদের কাছে এখনো রয়েছে।
এই জরিপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্যে উঠে এসেছে যে, তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ সম্পর্কের অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে এসব পদ্ধতির ওপর আস্থা রাখছেন।
এর মধ্যে ২৯ শতাংশ মানুষ ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং পদ্ধতির চর্চা করেন। এই প্রক্রিয়ার একটি পরিচিত ধরন স্ক্রিপ্টিং। অন্যদিকে ২৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল আংশিক সফলতার।
এছাড়া ২৫ শতাংশ সাইকিকের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন, ১৭ শতাংশ ট্যারো কার্ড রিডারের সাহায্য নিয়েছেন এবং ১৬ শতাংশ রাশিচক্র বা অ্যাস্ট্রোলজির ওপর ভরসা রেখেছেন। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ দৈনিক রাশিফল, ১০ শতাংশ সাইকিক বা ট্যারো রিডারের পরামর্শ এবং ৮ শতাংশ লাভ স্পেলের ওপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছেন।
এমনকি ১৯ শতাংশ তরুণ-তরুণী অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লাভ স্পেল বা বিশেষ রিচুয়ালের পেছনে অর্থব্যয় করতেও দ্বিধা করছেন না।
ম্যানিফেস্টেশন হলো ভবিষ্যতের লক্ষ্য বা কাঙ্ক্ষিত জীবনসঙ্গী পাওয়ার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে কল্পনা করা বা লিখে রাখার একটি প্রক্রিয়া, যা বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল কল্পনা বা জাদুমন্ত্র দিয়ে সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক ডেটিং অ্যাপের সহজলভ্যতা সত্ত্বেও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় অনেকে ট্যারো বা অ্যাস্ট্রোলজির মতো বিষয়ে মানসিক প্রশান্তি খুঁজছেন। এতে নিজের কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটি বাস্তবে তৈরি হয়েছে, এমনভাবে মনের ভাবনা লিখে রাখেন অনেকে। কিন্তু মনের কথা বোঝা কিংবা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটু আশ্বাস পেতে চান অনেকেই। পছন্দের মানুষটি ফিরবেন কি না, নতুন কেউ জীবনে আসবেন কি না কিংবা চলমান সম্পর্কটি টিকবে কি না।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রিয়জন হারানোর বেদনা বা সম্পর্কের টানাপোড়েনে এই ধরনের রিচুয়াল পালন করা মানুষের মানসিক অস্থিরতা কিছুটা কমাতে পারে। তবে কোনো জাদুমন্ত্র বা ট্যারো রিডিং অন্যের অনুভূতি বদলে দিতে পারে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কেবলই কোনো ঘটনার সঙ্গে আচারের সময় মিলে গেলে মানুষ সেটিকে কার্যকর মনে করতে পারে। কখনো মেসেজের উত্তর আসে না, কখনো সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না, আবার কখনো দীর্ঘদিনের সম্পর্কও ভেঙে যায় কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সেই আচার অন্য কারও অনুভূতি বা সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।
আধ্যাত্মিক চর্চা বিষয়ক গবেষণার তথ্যসূত্র
- DatingNews (৬ অক্টোবর ২০২৬): ১,০১৩ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত জরিপ, যা জেন-জিদের আধ্যাত্মিক চর্চার প্রবণতা তুলে ধরেছে।
- Harvard Business School (২০১৪): মাইকেল আই নর্টন ও ফ্রান্সেসকা জিনো-এর গবেষণা, যা শোক বা বিচ্ছেদ কাটিয়ে উঠতে রিচুয়ালের ইতিবাচক ভূমিকা ব্যাখ্যা করে।
- Harvard ও UC Berkeley (২০১৬): রিচুয়াল কীভাবে উদ্বেগ কমিয়ে কর্মক্ষমতা বাড়াতে পারে, তার ওপর করা একটি গবেষণা।
- Gabriele Oettingen (২০১৬): ইতিবাচক কল্পনা ও বাস্তব লক্ষ্য অর্জনের মধ্যে সম্পর্কের বিশ্লেষণ নিয়ে পরিচালিত গবেষণা।
- Pew Research Center (২০২৫): ৯,৫৯৩ জনের ওপর করা জরিপ, যা অনুযায়ী অধিকাংশ মানুষ বিনোদনের জন্য অ্যাস্ট্রোলজি বা ট্যারো চর্চা করেন।
গবেষক গ্যাব্রিয়েলে ওটিঙ্গেনের মতে, শুধু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর থাকলে লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা কমে যেতে পারে। শুধু স্বপ্ন দেখলেই কি মিলবে ভালোবাসা।
বরং সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং পারস্পরিক খোলামেলা আলোচনা করা বেশি কার্যকর। কেমন সঙ্গী চান, তা জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের প্রত্যাশা স্পষ্ট করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে খোলামেলা যোগাযোগও জরুরি।
ডেটিং নিউজের জরিপেও দেখা গেছে যে, সব জেন-জি শুধু আধ্যাত্মিকতার ওপর নির্ভর নন; বরং ৩৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী পেশাদার থেরাপির ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জরিপের ফল, বিশ্বের সব দেশের জেন–জির ওপর করা কোনো গবেষণা নয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকদের ২০১৬ সালের একটি গবেষণাও প্রাসঙ্গিক।
সব মিলিয়ে, প্রেম ও সম্পর্কে সোলমেট খোঁজার এই নতুন প্রবণতা মূলত অনিশ্চয়তার সময়ে এক ধরণের মানসিক আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা মাত্র।
সুস্থ সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন দুজনের সমান ইচ্ছা, সম্মতি ও পারস্পরিক বিশ্বাস।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- Harvard Business School, ২০১৪: Michael I. Norton ও Francesca Gino-এর Rituals Alleviate Grieving for Loved Ones, Lovers, and Lotteries গবেষণা। PubMed+1।
- Harvard ও UC Berkeley-এর গবেষক দল, ২০১৬: Don”t Stop Believing: Rituals Improve Performance by Decreasing Anxiety। faculty.haas.berkeley.edu।
- Gabriele Oettingen, ২০১৬: The Power of Prospection: Mental Contrasting and Behavior Change। Wiley Online Library।

















