বাংলাদেশের সুন্দরবনে মাছ ধরার নৌকা, মৌয়াল ও বাউয়ালিরা যখন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের গভীরে যান, তখন তাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মুখোমুখি হওয়া ঠেকাতে নতুন আশা দেখাচ্ছে ‘নাইলন ফেন্স’ বা নাইলনের জাল দিয়ে তৈরি বেড়া। বননির্ভর জনগোষ্ঠীর চলাচল রয়েছে এমন নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় হালকা ও টেকসই এই বেড়া স্থাপন করা হচ্ছে, যার ফলে ম্যানগ্রোভের পরিবেশের ক্ষতি না করেই মানুষ ও বাঘের মধ্যে একটি কার্যকর ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই নাইলন ফেন্স কংক্রিটের দেয়াল বা স্থায়ী ধাতব কাঠামোর মতো নয়। বিশেষ করে অস্থায়ী ক্যাম্প বা যেখানে বাউয়ালিরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, সেসব জায়গায় এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর। সুন্দরবনে সঠিক সীমানা নির্দেশক তৈরির মাধ্যমে উভয়ের নিরাপদে সহাবস্থান সম্ভব।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, একটি তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগ ইতোমধ্যে সুন্দরবনের চারপাশে ৭৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই নাইলনের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। ধানসাগর, কৈখালী ও কৈলাশগঞ্জের মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে এই শক্ত নাইলন জালের বেড়া বসানো হয়েছে। জোয়ার-ভাটা, কাদা ও ঋতু পরিবর্তনের মতো সুন্দরবনের বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশে এটি ব্যবহারের দিক থেকে খুবই উপযোগী।
নাইলনের বেড়া দেওয়ার পর থেকে মানুষ-বাঘের কোনো সংঘাত হয়নি দাবি করে হাছানুর রহমান জানান, ২০১৮ সালে সর্বশেষ লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। এরপর থেকে আর এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বাঘের জন্য এই নাইলনের বেড়া একটি মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে, যা দেখার পর বাঘ বা বন্যপ্রাণী বনে ফিরে যায়। তার মতে, গত চার-পাঁচ বছরে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। তাই নাইলনের বেড়াকে একক কোনো সমাধান হিসেবে না দেখে একটি বিস্তৃত কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংরক্ষণবিদদের মতে, এখান থেকে মূল শিক্ষণীয় বিষয় হলো- মানুষ রক্ষা আর বাঘ বাঁচানো দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।
সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার বা মানুষের ওপর আক্রমণের পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঠেকানো অনেক বেশি কার্যকর। বাঘ সচরাচর যে পথ দিয়ে চলাচল করে, সেখানে বেড়া দিয়ে মানুষকে আলাদা করতে পারলে তা সুরক্ষার বাড়তি স্তর হিসেবে কাজ করে। তবে পরিবেশবিদ ও সংরক্ষণকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, বেড়া এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে কোনো প্রাণী এতে আটকে না যায়, আঘাত না পায় বা তাদের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি না হয়। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলেও কোনো ব্যাঘাত ঘটে না।
সুন্দরবন হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল ও বিচরণ ক্ষেত্র। বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বর্তমানে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। শীর্ষ শিকারি হিসেবে সুন্দরবনের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, জীবিকার প্রয়োজনে হাজার হাজার মানুষের বনের ওপর নির্ভরতার কারণে মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে পুরোপুরি আলাদা রাখা প্রায় অসম্ভব। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও কাঠ সংগ্রহের জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত বনের ওপর নির্ভর করেন। কাজের প্রয়োজনে তাদের প্রায়ই বাঘের বিচরণক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হয়। এটি তুলনামূলকভাবে খুব দ্রুত বসানো যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খুলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব। বনের সীমানার কাছাকাছি মানুষের ঘুমানো, রান্না করা বা খাবার জমা রাখার কারণে এলাকাগুলো বাঘের আক্রমণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, বাউয়ালিদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি গ্রহণ, নিয়মিত টহল এবং বাঘের গতিবিধির বিষয়ে দ্রুত সাড়া দেওয়া।
উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বিগত ২০ বছরের ব্যবধানে বা আনুমানিক ২০০০ সাল থেকে মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্বে প্রায় ৩০০ জন মানুষ এবং ৩৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সব মিলিয়ে মানুষের ওপর আক্রমণ ও সংঘাতের ১৭২ থেকে ৩২৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের বাড়তি চাহিদার মুখে এই নাইলনের বেড়ার মতো কম খরচের প্রযুক্তি বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে বাস্তবসম্মত পথ দেখাচ্ছে।

















