প্রকৃতির বন্দনা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আর ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নৃত্যের তালে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের চলনবিল অঞ্চলের আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলো। ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশী তিথি উপলক্ষে এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব পালন করছেন। বর্ষাকালে কৃষিকাজের ব্যস্ততা কমে আসায় এবং প্রকৃতি যখন সবুজে ভরে ওঠে, তখনই তারা এই উৎসবে মেতে ওঠেন। এটি তাদের কাছে কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ঐক্য, আনন্দ ও সামাজিক বন্ধনের এক অনন্য প্রতীক।
চলনবিলের সাতটি উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা অন্তত ৪৫ থেকে ৫০টি গ্রামে এই উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে। মাহাতো, কুর্মি, সাঁওতাল, ওঁরাও, বড়াইক, পাহান এবং মাহালিসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ বংশপরম্পরায় এই উৎসব পালন করে আসছেন। সিরাজগঞ্জ জেলা আদিবাসী বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থার খৈচালা নির্মল মাহাতো জানান, সময়ের পরিক্রমায় অনেক ধর্মীয় রীতি সংকুচিত হয়ে এলেও কারাম উৎসব এখনো তাদের সংস্কৃতির জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে।
উৎসবের মূল রীতিনীতি অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের পার্শ্ব একাদশী থেকে কারাম গাছের ডাল পুঁজে এই পূজা শুরু হয়। শিক্ষার্থী মৌমিতা মাহাতোর ভাষ্যমতে, প্রাচীন রীতি অনুযায়ী কারাম গাছের ডাল কেটে পূজা করা হয় বলে অনেক জায়গায় একে ‘ডাল পূজা’ও বলা হয়। পূজা চলাকালীন যারা অংশগ্রহণ করেন, তাদের ‘কেরমেতি’ বলা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, উৎসবের পাঁচ থেকে সাত দিন তাদের আমিষ, তেল, হলুদ ও বিভিন্ন মসলাযুক্ত খাবার বর্জন করতে হয়। তাদের বিশ্বাস, এই নিয়ম না মানলে ‘জাঁওয়া’য় বীজ অঙ্কুরিত হবে না।
জাঁওয়া হলো আদিবাসীদের কাছে প্রকৃতির সন্তানের মতো একটি প্রতীকী ধারক, যেখানে মাটি, মুগ, কুর্থি ও ছোলাসহ বিভিন্ন বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটানো হয়। সোমবার বিশেষভাবে প্রস্তুত এই জাঁওয়া ডালার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। এরপর মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত চলে পূজার মূল আরাধনা। গ্রামের খোলা জায়গায় মাটিতে কারাম গাছের ডাল পুঁতে ফুল, ফিতা, শসা ও শাপলা দিয়ে সাজিয়ে মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে চলে প্রার্থনা। বুধবার রাতে মূল ধর্মীয় আচার ও পূজা সম্পন্ন হয়েছে।
ধর্মীয় গাম্ভীর্যের পাশাপাশি কারাম উৎসবকে ঘিরে আদিবাসী পল্লীগুলোতে লোকজ সংস্কৃতির উৎসব বসে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীরাই মেতে ওঠেন ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নৃত্য আর লোকগানে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চলনবিলের মাটিতে আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন ধরে রেখেছেন। পরিবারের মঙ্গল এবং ফসলের প্রাচুর্য কামনায় প্রতি বছর তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই উৎসব উদযাপন করে থাকেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বর্ষায় প্রকৃতি যখন সবুজে ভরে ওঠে, খাল-বিল ও নদী-নালা পানিতে পূর্ণ হয় এবং কৃষিকাজে কিছুটা বিরতি আসে, তখনই পালিত হয় এ উৎসব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর পরিচর্যা ও সংরক্ষণ প্রকৃতির শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা ও পূজারই একটি অংশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডালের গোড়ায় ডালা রেখে কাঁসার থালায় বরণডালা নিয়ে পূজায় অংশ নেন তারা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারাম উৎসব তাই শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; প্রকৃতি, ফসল, বংশপরম্পরা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে ঘিরে গড়ে ওঠা আদিবাসী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।












